ঢাকায় ফিরব, নাকি থেকে যাব?

উপন্যাস অ্যাভাটার
পড়তে ৩ মিনিট
এই লেখায়

একটু খোলামেলাভাবে কিছু কথা বলি। মার্চের শুরুতে যখন প্রথম ঘোষণা এল যে দেশে তিনজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তার আগে থেকেই বিষয়টা কিছুটা আঁচ করতে পারছিলাম। তাই ১৬ মার্চ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লাম। কিন্তু যতটা ভেবেছিলাম, পরিস্থিতি তার চেয়েও খারাপ হলো। ফলে এখানেই আটকে গেলাম, ঢাকায় আর ফেরা হলো না।

আমার নিজের একটা ধারণা

এতদিন আমার মনে একটা ধারণা ছিল, একেবারেই নিজস্ব ধারণা, কোনো প্রমাণ ছাড়া। মনে হতো, টিভিতে আক্রান্তের যে সংখ্যা দেখানো হয়, আসল সংখ্যাটা তার চেয়ে বেশি। সঙ্গে এটাও ভাবতাম, অনেক বড় একটা সংখ্যা হুট করে সবার সামনে চলে এলে মানুষ হয়তো প্যানিক হয়ে যাবে, প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় পড়ে যাবে। দুশ্চিন্তা একজন সুস্থ মানুষকেই অসুস্থ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, আর যারা সত্যিই আক্রান্ত, তাদের ওপর কেমন প্রভাব পড়বে সেটা না হয় না-ই বললাম।

ঈদের আগে পর্যন্ত আমি এমনটাই ভাবতাম। কিন্তু হঠাৎ দেখলাম, ঈদের আগে সীমিত পরিসরে সব কিছু খুলে দেওয়া হলো। এমন সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো, তার কারণ বোঝার চেষ্টা করতে করতেই দেখলাম যানবাহনও চালু হয়ে গেল।

মাথায় নানা রকম ব্যাখ্যা আসছিল। হতে পারে আমাদের কথা ভেবেই সব কিছু ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ ছেড়ে না দিলেও যে লুকিয়ে লুকিয়ে যে যার মতো দোকান খুলবে, বাড়ি যাবে, এটা সবাই জানে। ঈদের নামাজের আগে ইমাম সাহেব যে কথাটা বললেন, সেটাও অনেকটা এ রকমই। তিনি বললেন, করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে গেছে বলে নয়, হাজার নিষেধ করলেও বাঙালি ঈদের নামাজ পড়বেই, তাই বাধ্য হয়েই নামাজ পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যেন অন্তত কিছু নিয়মকানুন মেনে নিরাপদে নামাজটা পড়া হয়। আবার এর কোনোটাই না হয়ে অন্য কিছুও হতে পারে। আসল ঘটনা কী, বোঝা মুশকিল।

সবাই ঢাকায় ফিরছে

ঈদের পর এই নিয়ে নতুন করে জল্পনাকল্পনা শুরু করার আগেই এখন শুনছি, ১৫ জুনের পর আর সাধারণ ছুটি বাড়ানো হবে না, সব কিছু স্বাভাবিক নিয়মে চলবে। আজ খবরের পাতায় পাতায় একই কথা, ঢাকামুখী মানুষের ভিড় বাড়ছে, সবাই ঢাকায় ফিরে যাচ্ছে। কিন্তু এমন কেন? আজই তো দেখলাম আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেড়েছে। অনলাইনে একটা হেডলাইনে চোখে পড়ল, সর্বোচ্চ পরীক্ষায় সর্বোচ্চ শনাক্ত, এক দিনে ২,৫২৩ জন।

তাহলে এভাবে লকডাউন তুলে নেওয়া কি ঠিক হবে? দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাঁরা আছেন, তাঁরা কী ভেবে এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, আমি জানি না। হয়তো তাঁরা এমন কিছু দেখছেন, যা আমি দেখতে পাচ্ছি না। তবে গ্রামবাসী হোক বা শহরবাসী, এই দেশের গুটিকয়েক মানুষ বাদে কাউকে দেখে মনেই হয় না যে করোনায় আক্রান্তের হার প্রতিদিন কমছে না, বরং বেড়েই চলেছে।

মোড়ে গিয়ে যা দেখলাম

চিন্তার বিষয় হলো, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকলেও লকডাউনের প্রভাব প্রথমে যেমন ছিল, আজ তার সামান্যতমও নেই, দিন দিন আরও কমছে। গতকাল একান্ত প্রয়োজনে বাজারে যাওয়ার জন্য বের হয়ে মোড়ে গেলাম। দেখলাম রাস্তা একদম গরম। যতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম, শুধু বাসটাই চোখে পড়ল না, তা ছাড়া রীতিমতো সব কিছুই চলছে, কোনো রকম করোনা প্রতিরোধের ব্যবস্থা ছাড়াই।

অত মানুষের মধ্যে দু-একজন ছাড়া কারও মুখে মাস্ক নেই, নিরাপদ দূরত্ব বলেও কিছু নেই। আর তাদের যুক্তিটাও কী সুন্দর। তারা বলছে, এ পর্যন্ত এখানে কারও করোনা ধরা পড়েনি, তাই চিন্তার কিছু নেই। কথাটা ঠিক আছে, কিন্তু তারা বুঝতে চায় না যে এখনো ধরা পড়েনি মানে এই না যে ধরা পড়বে না। আর যত দিনে একজন রোগী শনাক্ত হবে, তত দিনে তার থেকে আরও কত মানুষ আক্রান্ত হবে, তার কি কোনো হিসাব আছে?

তাহলে আমি কী করব?

তাহলে কি এতদিন আমি ভুল ভেবে এসেছি? হয়তো টিভিতে যে সংখ্যা দেখানো হয়, সেটাই ঠিক। আর করোনার ভয়ে দিন কাটাচ্ছি শুধু আমি একাই, এমনও হতে পারে।

ভেবেই পাচ্ছি না এখন আমি কী করব। যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে যায়, তাহলে কি চারপাশের সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে, নিজের এতদিনের সব চিন্তাভাবনা ভুল মেনে নিয়ে ঢাকায় ফিরে যাব? নাকি নিজের ভাবনাটাই ঠিক ধরে নিয়ে কুরবানির ঈদ পর্যন্ত গ্রামের বাড়িতে থেকে যাব, তারপর ঢাকা ফিরব? উত্তরটা এখনো খুঁজছি।

এটা পুরোটাই ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনার ব্যক্তিগত পোস্ট, কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক ইস্যু নয়।

উপন্যাস অ্যাভাটার

লিখেছেন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।