সবই নিয়তি

উপন্যাস অ্যাভাটার
পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায়

২০২০ সালের শুরুর দিকের ঘটনা। আমার পরীক্ষা শেষ, ক্লাস শুরু হব হব করছে, আর জামানের ততদিনে পুরোদমে ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। একদিন সে বলল, তুমি তো ফ্রি আছ, নীলক্ষেত গেলে আমার কিছু বই কিনে দিয়ো তো।

অন্য সময় হলে হয়তো কাজটা করার জন্য বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দিতাম, কিন্তু দেখলাম সত্যিই তার সময় নেই। বেচারার জন্য একটু মায়া হলো, তাই বললাম, ঠিক আছে, কী কী বই লাগবে একটা লিস্ট করে দিয়ো। সে প্রথমে অনেকগুলো বইয়ের একটা লিস্ট ধরিয়ে দিলেও পরে বলল, এখন তো সব লাগবে না, তুমি এটা, এটা আর এটা, মোট এই ৩টা বই কিনলেই হবে। আর নীলক্ষেতে অমুক দোকানে গেলে এই বইগুলো পেয়ে যাবে, খুঁজে বেড়াতে হবে না।

ফাল্গুনীর প্রথম ট্রিপ

পরের দিন নীলক্ষেতে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই ক্যাম্পাসে গেলাম, কিন্তু পুরো ক্যাম্পাস ঘুরেফিরে দেখতে গিয়ে নীলক্ষেত যেতে একটু দেরি হয়ে গেল। জলদি সব কিছু সেরে ফেলতে না পারলে ফাল্গুনীর প্রথম ট্রিপ মিস করব। তাই তাড়াহুড়ো করে জামানের বলা সেই দোকানে গেলাম। আমি যেমন ভেবেছিলাম, দোকানটা তেমন খুব একটা বড় না। যা-ই হোক, সেখানে ঢুকতেই দোকানে যিনি বসে ছিলেন তিনি বললেন, কেমন আছেন? আজকে আপনার ক্লাস নাই?

তাঁর কথা শুনেই বুঝলাম, লোকটা জামানকে চেনেন, হয়তো বেশ কিছুদিন ধরেই তাঁর কাছ থেকেই বই কেনে। কিন্তু এখন আমি কী করি? তাঁকে কি বলব যে আপনি হয়তো আমাকে জামান ভেবেছেন, আসলে আমি সে নই, আমি তার যমজ ভাই, সে EEE-তে পড়ে আর আমি বোটানি ডিপার্টমেন্টে, সে বই কিনতে আসার সময় পায়নি তাই তার বই আমি কিনতে এসেছি, ইত্যাদি ইত্যাদি? এত কিছু বলার সময়ও তো নেই, দেরি করলেই ফাল্গুনী মিস। তা ছাড়া অচেনা লোক বুঝতে পারলেই তো বেশি দাম চেয়ে বসবেন। তাই আর কথা না বাড়িয়ে বললাম, জি ভাই, আজকে আমার ক্লাস নাই, আমার ছুটি চলে।

ল্যাও ঠ্যালা সামলাও

তিনি ওপরে উঠে খুঁজে খুঁজে একটা বই বের করে দিলেন। দিয়ে বললেন, ভাই, এই বইটা নেন, আর আপনি যে ২য় বইটা চেয়েছেন, সেটা আপনার ডিপার্টমেন্টে আমি ৩০ কপি পাঠিয়েছি গত পরশু। আপনার সিআর অভিজিৎকে কল দেন, আরও কপি লাগলে আমি আপনার ডিপার্টমেন্টে পাঠিয়ে দেব। ল্যাও ঠ্যালা সামলাও। এখন কী করি? জামানকে কল দিলাম, কিন্তু সে কলটা কেটে দিল। একটা মেসেজ এল, সে ক্লাসে আছে, কিছুক্ষণ পরে ক্লাস শেষ হবে।

আর কী করার, পরে বাড়ি গিয়ে জামানকে বিষয়টা বলব, যেন সে তার সিআরকে জানায়। কিন্তু এখন তো সেটা সম্ভব না, তাই বিষয়টা একটু এড়ানোর চেষ্টা করলাম। বললাম, আচ্ছা ভাই, আমি তাকে জানিয়ে দেব, আর কত কপি লাগবে সেটাও বলে দেব। এই বলে তাঁর মোবাইল নম্বরটা চেয়ে নিলাম। মনে মনে ভাবলাম, এই যাত্রায় একটুর জন্য বেঁচে গেলাম। কিন্তু এ তো কেবল শুরু।

আরেকটা বই চাইতেই তিনি বললেন, ভাই, আপনার সিনিয়র রাফি ভাই আছে না, গত বছর তারা এই ৩য় বইটার বদলে এই বইটা নিয়ে গিয়েছিল। এই বলে আরেকটা বই আমার সামনে রাখলেন। রেখে বললেন, ভাই, এটা দুই বছর পর পর লাগে, মানে এই বছর নিলে পরের বছর লাগে না, তার পরের বছর আপনাদের ডিপার্টমেন্টের সবাই নিয়ে যায়। তাহলে কি এটা কপি করতে দেব ভাই? আর কত কপি লাগবে, একটু আপনার সিআরকে একটা কল দিয়ে কনফার্ম করলে আমি আজকেই কপি করতে দিয়ে দেব, কাল-পরশুর মধ্যে আপনার ডিপার্টমেন্টে পৌঁছে দেব।

এবার আর কিছু বলে বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগই পেলাম না। কল দেন, কনফার্ম করেন বলে বলে এমনভাবে জাপটে ধরলেন যে কী বলব বুঝে পাচ্ছিলাম না। কী আর করার, সবই নিয়তি।

বোটানির বই লাগবে না?

তাঁকে বললাম, ভাই, আপনি আমাকে যে ভাবছেন, আমি সে নই। জামান আমার যমজ ভাই, সে সময় পায়নি, তাই আমি তার বই কিনতে এসেছি। কথাগুলো শুনে তিনি বললেন, আচ্ছা ভাই। আমি তো ভেবেছিলাম এই বুঝি বকাঝকা শুরু করবেন, কিন্তু না। তিনি বললেন, ভাই, আপনার বোটানির কোনো বই লাগবে না? তাঁর কথা শুনে মনে হলো, একেই বলে বিজনেসম্যানের স্ট্র্যাটেজি। যা-ই হোক, কত টাকা লাগবে জিজ্ঞেস করে টাকাপয়সা দিয়ে দ্রুত ক্যাম্পাসের দিকে রওনা দিলাম।

কিন্তু ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে হতাশাজনক যে ঘটনাটা ঘটে, সেটাই ঘটল। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি ফাল্গুনী চলে যাচ্ছে, কিন্তু আমি যত দূরে আছি, সেখান থেকে দৌড়েও লাভ নেই, ডাক দিয়েও লাভ নেই। তারপরও সবাই যা করে, একটু পিছু পিছু দৌড় দিলাম, এই আশায় যে যদি জ্যামে পড়ে। কিন্তু কপাল এমনই যে শেষমেশ লোকাল বাসে বাসায় এলাম।

রাতে জামানকে সব ঘটনা খুলে বললাম। পরে জানতে পেরেছিলাম, লোকটা আমার কাছ থেকে বইটার দাম ঠিকই বেশি নিয়েছিলেন। মানে দিন শেষে আমার আম তো গেলই, সঙ্গে ছালাটাও গেল।

উপন্যাস অ্যাভাটার

লিখেছেন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।