বন ভবনে একটি স্মরণীয় দিন

উপন্যাস অ্যাভাটার
পড়তে ৭ মিনিট
এই লেখায়

মনে রাখার মতো একটা দিন গেল আজ। সত্যি বলতে, বুড়ো বয়সে সময় কাটানোর খোরাক হয়তো এগুলোই।

আজ বন ভবনে, মানে আগারগাঁওয়ে বন অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে, বাংলাদেশের উদ্ভিদের রেড ডাটা লিস্ট হালনাগাদ আর দেশের কয়েকটি সংরক্ষিত এলাকায় বিদেশি উদ্ভিদ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একটা সেমিনার ছিল। সেখানে হাজির ছিলাম, তবে নিমন্ত্রণপত্র নিয়ে সে এক লম্বা কাহিনি। বলতে শুরু করলে আরও তিন দিন আগের ঘটনা থেকে বলতে হবে, তাই আর বললাম না। এমনিতেই অনেকের অভিযোগ, আমি নাকি পোস্ট অনেক বড় করে ফেলি, পড়তে অসুবিধা হয়। কিন্তু আমি তো আর ইচ্ছা করে বড় করি না, এটা ওটা বলতে বলতে কখন যে পোস্ট লম্বা হয়ে যায় নিজেই টের পাই না। আর একটা ঘটনা তো টুকরো টুকরো করে বলা যায় না, তখন নিজের কাছেই খাপছাড়া লাগে।

যা-ই হোক, আর ভণিতা না করে আজকের স্মৃতিগুলো মনের ভেতর থেকে একটা একটা করে তুলে আনি।

রামপুরা থেকে আগারগাঁও

সকালে উঠেই শুনলাম সিয়াম প্রোগ্রামে যেতে পারবে না, মনটা একটু খারাপই হলো। তবে আসল প্রোজেক্টে যেন সে যেতে পারে, এই কামনা করেই রওনা দিলাম রামপুরার টিভি সেন্টারে। সেখান থেকে সম্রাট ভাই, রবিন ভাই, ফাহাদ ভাই, আমরা সবাই একসঙ্গে হয়ে যাব আগারগাঁও। বন ভবনের হৈমন্তী অডিটোরিয়ামে ছিল আমাদের আজকের প্রোগ্রাম। বড় ভাইদের সঙ্গে গল্প করতে করতে হাতিরঝিলের উপর দিয়ে উবারের হাওয়া খেতে খেতে ঠিক সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম।

সেখানে গিয়ে আমাদের ডিপার্টমেন্টের বেশ কয়েকজন স্যারকে দেখতে পেয়ে ভালোই লাগল। আর আজ যে স্যারের ক্লাস ছিল, তাঁকেও প্রোগ্রামে হাজির দেখে আমি যে কী খুশি হয়েছিলাম, বলার মতো না। কিছুক্ষণ পরে সবাই নিজ নিজ জায়গায় বসে পড়ল, আর আমাদের বলা হলো, সবার জায়গা সংকুলান না-ও হতে পারে, তাই আপনারা যারা রেড ডাটা লিস্টের না, তারা নিচের করবী কনফারেন্স হলে চলে যান। তাতেই বুঝলাম, অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের পরেই সেমিনারটা দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাবে, একসঙ্গে দুটোতে থাকা যাবে না। কী আর করা, আমরা সবাই নিচে চলে এলাম।

করবী হলের প্রজেক্টর আর গ্রামের সেই নেটওয়ার্ক

করবী হলে গিয়ে মনে হলো, দেশটা সত্যিই ডিজিটাল হয়ে গেছে। ব্যবস্থা মোটেও খারাপ না। সারা হল জুড়ে তিন দিকে তিনটা প্রজেক্টর, আর উপরে যা হচ্ছে সবই জুম অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি দেখানো হচ্ছে। প্রথম প্রথম ভালোই চলছিল, কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই শুরু হলো সাউন্ড সিস্টেমের সমস্যা। কত রকমের কত বিচিত্র শব্দ যে হচ্ছিল, নিজে উপস্থিত না থাকলে তা কখনো বোঝা যাবে না। সাউন্ড ঠিক হলো তো শুরু হলো নতুন সমস্যা। বারবার দেখায় নেটওয়ার্ক আনস্টেবল, এই থামে, এই যায়।

মহামারির সময় যখন গ্রামের বাড়িতে ছিলাম, জুমে ক্লাস করতে গিয়ে ঘণ্টাখানেকের ক্লাসে কতবার যে ডিসকানেক্টেড হয়ে যেতাম তার হিসাব থাকত না। খুবই হতাশ লাগত। কিন্তু আজ আমার এতদিনের সেই হতাশার অবসান ঘটল। সরকারি ভবনে অত্যাধুনিক সবকিছু থাকার পরেও যদি উপরের ঘর থেকে নিচের ঘরে কানেক্ট করতে ব্রডব্যান্ডের নেটওয়ার্ক আসা-যাওয়া করে, তাহলে আমি গ্রামের বাড়িতে বসে হতাশ হব কেন?

এইসব ঝুটঝামেলা থেকে রেহাই পেলাম যখন একজন কর্মকর্তা এসে বললেন, আপনারা যারা আছেন সবাই উপরে চলে আসেন, ছড়ানো-ছিটানো কিছু জায়গা বাকি আছে। এক লাফে উঠে দৌড় দিলাম দোতলার হৈমন্তী অডিটোরিয়ামে। গিয়ে দেখি বনমন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে বন উপমন্ত্রী, জাতীয় হার্বেরিয়ামের প্রধানসহ আরও অনেকে উপস্থিত। শুরু হলো অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান। তাঁরা অনেকেই নানা বিষয়ে কথা বললেন, দেশের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরলেন, সঙ্গে ভবিষ্যতে কী কী ধরনের পরিকল্পনা হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করলেন। দেখতে দেখতে সময় কেটে গেল, অনুষ্ঠানের এই অংশও শেষ হলো।

আসল প্রোগ্রাম আর ৫০০ টাকার চমক

চা বিরতিতে নাস্তা নিয়ে আবার চলে এলাম সেই করবী কনফারেন্স হলে। এবার শুরু হলো আসল প্রোগ্রাম। কারা আগ্রাসী উদ্ভিদ, কিসের ভিত্তিতে তাদের ক্ষতিকর বলে চিহ্নিত করা যায়, কারা বিদেশি উদ্ভিদ, কীভাবে তাদের শনাক্ত করা যায়, অনেক কিছুই জানতে পারলাম। সঙ্গে একজন প্রফেসরের কাছে কিছু কথা শুনে অবাকও হলাম। ইউক্যালিপটাস (Eucalyptus camaldulensis), আকাশমণি (Acacia auriculiformis), এই গাছগুলোকে যাঁরা প্রথমে উপকারী বলে দেশে এনে লাগাতে উৎসাহ দিতেন, আজ তাঁরাই এগুলো না লাগানোর জন্য উৎসাহ দিচ্ছেন। তাই নতুন কোনো গাছ উপকারী হবে নাকি অপকারী, সেটা লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে বলা যায় না, কিছু সময় পরে বোঝা যায়। আর আরেকটা কথা, অন্য দেশে যে গাছ উপকারী, আমাদের দেশের জন্যও সেটা উপকারী হবে, এমনটা না-ও হতে পারে।

আরেকটা বিষয় অনুভব করলাম। আজকের সেমিনারে দেশের সেরা উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা উপস্থিত ছিলেন বলেই ধারণা করি, কিন্তু তাঁদের মধ্যে কেমন যেন যোগাযোগের অভাব মনে হলো। হয়তো বছরে এমন দু-একটা সেমিনার হয়, আর সেই সেমিনারের আড়াই-তিন ঘণ্টার জন্যই তাঁরা একসঙ্গে হন। কারণ বেশ কিছু বিষয়ে তাঁদের মধ্যে কোনো সমাধান হলো না, সময় শেষ হয়ে গেল, বিষয়গুলো অমীমাংসিত অবস্থাতেই থেকে গেল। কে জানে কবে এর সমাধান হবে। অবশ্য আমার ধারণা ভুলও হতে পারে।

যা-ই হোক, একে একে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসররা তাঁদের মূল্যবান আইডিয়াগুলো উপস্থাপন করলেন। এর মাঝেই ঘটল এক মজার ঘটনা। দেখলাম হাতে হাতে একটা খাতা পাশ হতে হতে এদিকে আসছে। ভাবলাম, কে কে আছে হয়তো তার একটা লিস্ট। খাতাটা একটু কাছে আসতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। নামের পাশে টাকার একটা ছক। দেখলাম ফাহাদ ভাই আগের পাতাগুলো উল্টে দেখছেন কে কত টাকা দিয়েছে। সবাই ৫০০ টাকা করে দিয়েছে। রবিন ভাইও তা-ই দিল। আমি আবার সামনে বসা কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনিও তা-ই বললেন। কী আর করা, আমিও নাম আর ৫০০ টাকা লিখে পাশের জনের হাতে দিলাম, আর মনে মনে হিসাব করলাম, ৫০০ টাকা দিয়ে একটা সেমিনারে এলাম। একটু অনুশোচনাও হচ্ছিল, ৫০০ টাকা দিতে হবে আগে জানলে হয়তো আসতামই না। তারপর ভাবলাম, কত টাকা কত দিকে যায়, এমন তথ্যবহুল সুন্দর একটা সেমিনারের জন্য না হয় দিলামই।

কিছুক্ষণ পরে একজন কর্মকর্তা সবার হাতে হাতে একটা করে খাম দিয়ে গেলেন। সেই চমক, সেই। খামের ভেতর থেকে কাগজের মতো একটা কিছু বের করে দেখি ৫০০ টাকার এক কড়কড়ে নোট। কী যে চমক ছিল এটা। আমি তো হেসে কুটিকুটি।

খাবারের ব্যাগ আর বিলিম্বি গাছ

বেশিক্ষণ আর বসে থাকতে হলো না। অল্পক্ষণ পরেই সেমিনার শেষ, খাবারের ব্যাগ চলে এল। ব্যাগ খুলতেই স্টেজের মতো সাজানো খাবারের সব বাটি। দেখেই আমাদের ডিপার্টমেন্টের খাবারের কথা মনে পড়ে গেল। ডিপার্টমেন্ট যে আরও কত দিন বন্ধ থাকবে, আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন। অনেক দিন পর বড় ভাইদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে গল্প করতে করতে দুপুরের খাবার শেষ করলাম। শুধু মনে হচ্ছিল, জহিরের ক্যান্টিনে ঘাসের উপর বসে সবাই মিলে দুপুরের খাবার কত দিন খাই না।

একটু বিশ্রাম নিয়ে এবার বন ভবনকে বিদায় দেওয়ার পালা। ধীরেসুস্থে গেট দিয়ে বেরিয়ে চলে যাব, ঠিক সেই সময় একটা বিলিম্বি গাছ (Averrhoa bilimbi) চোখে পড়ল। আমি ছোট মানুষ, হাতই পেলাম না। দিপন কিছু বিলিম্বি পেড়ে দিতে সাহায্য করল। তারপর রবিন ভাই আর দিপন দুজন দুদিকে চলে গেল। আর আমি, ফাহাদ ভাই আর সম্রাট ভাই রওনা দিলাম বাসায় ফেরার সিএনজির খোঁজে।

খালি সিএনজির খোঁজে

আমরা তিনজন দাঁড়িয়ে আছি আইডিবি ভবনের সামনে, সিএনজি নাই তো নাই। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সবাই আবার রাস্তা পার হয়ে ওপারে গেলাম। এপাশে যেগুলো দেখে এলাম সেগুলো সব ভরা, খালি নাই তো নাই। এখানেও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সম্রাট ভাই বলল, চলো রিকশায় ফার্মগেট চলে যাই, সেখানে সিএনজি পাওয়া যাবে। কথামতো ফার্মগেটের দিকে যেতে যেতে অনেক সিএনজি দেখে কী মনে হলো, বিজয় সরণিতে নেমে পড়লাম। নেমেই এক বোকামি করলাম। অগুনতি সিএনজি যায়, কিন্তু একটাও খালি নাই। সেখানে আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কোনো উপায় না দেখে হাঁটা ধরলাম। কাদা-পানিতে হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছালাম ফার্মগেটের আগের লিংক রোডে। আবারও একই অবস্থা, কোনো সিএনজি ফাঁকা নাই।

এবার তো সম্রাট ভাই একদম বসেই পড়ল। উবারে কল দিয়ে প্রথমটা ক্যানসেল, আরেকটা রিসিভ করল, কিন্তু কেন জানি না দ্বিতীয়টাও ক্যানসেল। হঠাৎ একটা সিএনজি ফাঁকা দেখে ভাই চিৎকার দিয়ে উঠল। সিএনজির পাশে যেতেই আরেকটা ফাঁকা সিএনজি এসে সেখানেই থামল, ভালোই হলো। প্রথমটা ভাড়া বেশি চাইল বলে ভাই রাজি না হয়ে পরেরটার ভরসায় ছেড়ে দিল। দ্বিতীয়টাকে জায়গার নাম বলতেই যাব না বলে চলে গেল। প্রথম জনকে তার চাওয়া ভাড়াই দিতে চাইলাম, কিন্তু সে আর ফিরে তাকাল না। চলে গেল তো গেলই। আমরা তো একদম হতাশ। অবশেষে কীভাবে যেন একটা সিএনজি ম্যানেজ হলো, তাতে করে বাসায় ফিরে এলাম।

দিনটা ভালোই ছিল, স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শেষে ধন্যবাদ জানাই জসীম উদ্দিন স্যারকে। তিনি আমাদের এমন একটা সুন্দর সেমিনারে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন বলেই আজ অনেক কিছু জানতে পারলাম।

এর কয়েক সপ্তাহ পরেই আমরা রওনা দিয়েছিলাম রেমা-কালেঙ্গার পথে। সেই দিনগুলোর গল্প আছে ‘রেমা-কালেঙ্গার দিনগুলো’ সিরিজে।

উপন্যাস অ্যাভাটার

লিখেছেন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।