বোটানি-৬৫ শিক্ষাসফর ২০২২ (পর্ব ১): কার্জন হল থেকে মেঘের দেশ সাজেকে

উপন্যাস অ্যাভাটার
পড়তে ৯ মিনিট
এই লেখায়

তখন রাত ৮টা। কথামতো কার্জন হলের সামনে প্রায় সবাই হাজির। সবার চোখেমুখে শিক্ষাসফরে যাওয়ার একটা উচ্ছ্বাস ফুটে উঠছিল, আর সেটাই স্বাভাবিক। করোনার জন্য পরপর দুবার আমাদের শিক্ষাসফর বাতিল হয়েছিল, তৃতীয়বারে এসে অবশেষে পরিকল্পনাটা সফল হতে যাচ্ছে। সবাই এসে পৌঁছালে শ্রদ্ধেয় স্যার ম্যামরা সংক্ষেপে কিছু দিকনির্দেশনা দিলেন, তারপর একটা গ্রুপ ছবি।

আমরা ৩৯ জন শিক্ষার্থী, ৪ জন শিক্ষক (মিহির স্যার, তাহমিনা ম্যাম, চন্দন স্যার ও আবুল কাশেম স্যার) আর ১ জন স্টাফ (সাইফুল ভাই), মোট ৪৪ জনের দল রওনা দিলাম প্রথম গন্তব্য সাজেকের উদ্দেশে। আমাদের শিক্ষাসফরের প্রধান জায়গা ছিল তিনটা: সাজেক, খাগড়াছড়ি আর রাঙামাটি।

সেন্টমার্টিন থেকে সাজেক

তবে শুরু থেকেই যে আমরা এই জায়গাগুলোতে যেতে চেয়েছিলাম, এমন নয়। প্রথম পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে হয়তো আমরা সেন্টমার্টিন আর কক্সবাজারের পথে রওনা দিতাম। কিন্তু সেন্টমার্টিনে যাওয়ার পথ বন্ধ থাকায় সেটা আর সম্ভব হয়নি। তাহলে কোথায় যাওয়া যায়, এই নিয়ে স্যারদের সঙ্গে অনেক আলোচনা হলো। প্রথমে সুন্দরবনের কথা উঠল। আমি মনে মনে রাজি ছিলাম, কারণ সুন্দরবনের পরিবেশ অন্য সব জায়গার চেয়ে আলাদা। কিন্তু সেখানে গেলে পুরোটা সময় লঞ্চে থাকতে হতো, কষ্টটা একটু বেশিই হতো, তাই সেই পরিকল্পনাও বাতিল হলো।

মিহির স্যার আলোচনায় যারা ছিল সবাইকে আবার জিজ্ঞেস করলেন, আর কোথায় যাওয়া যায়। আমাদের একজন বলে উঠল, সাজেক। সবাই রাজি হয়ে গেল, আর সাজেকের সঙ্গে যুক্ত হলো খাগড়াছড়ি আর রাঙামাটি। সব মিলিয়ে চার দিনের এই শিক্ষাসফরের একটা খসড়া তৈরি হয়ে গেল। আজ সেই খসড়ার প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের শুরু।

বাসে রাত ১টার বিশ্বকাপ

দেখতে দেখতে ইট-পাথরের উঁচু উঁচু দালানকোঠা পেরিয়ে আমরা ঢাকা শহরের বাইরে চলে এলাম। বাসের ভেতরে যারা গানবাজনায় মেতে ছিল, একসময় তারাও নিজ নিজ সিটে বসে পড়ল। চারদিক নীরব, সবাই বিশ্রাম নিচ্ছে, কেবল বাসটা আপন মনে চলছে। কিছুটা পথ পেরিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে যাত্রাবিরতি হলো। ফ্রেশ হয়ে, চা খেয়ে আবার বাসে উঠলাম।

ভেবেছিলাম বাকি পথটা হয়তো নীরবেই কাটবে, কিন্তু ফিফা বিশ্বকাপের কথা মাথায় ছিল না। রাত ১টা বাজতেই পুরো বাস দুই দলে ভাগ হয়ে গেল, ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা, আর মেয়েরাও সমান তালে তাতে যোগ দিল। সাউন্ড বক্সে খেলার ধারাভাষ্য চলছে, বাকি সবাই নিজ নিজ মোবাইলে খেলা দেখছে। কিন্তু নেটওয়ার্কের সমস্যায় খেলা ভালোমতো দেখা যাচ্ছিল না, সবার মন একটু খারাপ। একপর্যায়ে নেটওয়ার্ক একেবারেই নেই, কোনো আপডেট পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ একজন চিৎকার করে বলল, আর্জেন্টিনা গোল দিয়েছে। ব্যস, পুরো বাস আর্জেন্টিনার স্লোগানে মুখরিত। রাত ৩টার পর খেলা শেষ হলে বাস আবার ধীরে ধীরে নীরব হয়ে এল।

তবে এই নীরবতা ক্ষণস্থায়ী। সকাল সাড়ে ৪টা নাগাদ আমরা মাটিরাঙ্গায় পৌঁছে গেলাম। এখান থেকে সব যানবাহন একসঙ্গে খাগড়াছড়িতে ঢুকবে, গাড়ি ছাড়তে কিছুটা দেরি আছে। বাস থেকে নেমে আশপাশটা একটু ঘুরে দেখলাম, তবে সূর্য ওঠেনি বলে দেখার সুযোগ তেমন হয়নি। একটা টঙের দোকানে বসে সবাই চা খেলাম। চা খেতে খেতে চন্দন স্যার, আবুল কাশেম স্যার আর সুবর্ণা ম্যাম আমাদের সঙ্গে যেভাবে বন্ধুর মতো কথা বললেন, সেটা সত্যিই কল্পনার বাইরে। মনে হচ্ছিল বড় ভাই, বড় বোন আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন, আর আমরা শুনছি কীভাবে কী করা যায়। শিক্ষাসফরের এই একটা জিনিস আমার খুব ভালো লাগে, সবাইকে অনেক কাছ থেকে দেখা যায়, অনেক কাছে পাওয়া যায়। মনে মনে এমন সময় আরেকটু বেশি চেয়েছিলাম, কিন্তু সুখ সবসময়ই ক্ষণস্থায়ী। গাড়ি চলাচল শুরু হতেই সবাইকে বাসে উঠে পড়তে হলো। তবে স্মৃতির পাতায় এমন ঘটনার লেখা কেবল শুরু, পুরো শিক্ষাসফরটাই তখনো বাকি।

ইকোছড়ি ইন আর চান্দের গাড়ি

ধীরে ধীরে আমরা খাগড়াছড়িতে ঢুকলাম। সাজেকে যেতে হয় মূলত খাগড়াছড়ি হয়েই। পূর্ব আকাশে সূর্য উঠছে, আঁকাবাঁকা রাস্তা, তার ধার ঘেঁষে উঁচু-নিচু পাহাড় আর ছোট-বড় গাছপালা এখন হালকা চোখে পড়ছে। জানালার ধারে বসে এসব দেখতে দেখতে খাগড়াছড়ি বাজারের ভেতর দিয়ে সকাল সাড়ে ৬টা নাগাদ একটা হোটেলে এসে পৌঁছালাম, হোটেল ইকোছড়ি ইন। আমার কাছে এই হোটেলটাই একটা দর্শনীয় জায়গা মনে হলো। নীল কাচে ঢাকা সুন্দর একটা হোটেল, চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা, নিচে তাকালে ধান আর আখের খেত। হোটেলের সামনের রং-বেরঙের ফুলগুলো দেখে মন জুড়িয়ে যায়: গেটের ওপরে মধুমঞ্জরী (Combretum indicum), ভেতরে হলুদ কাগজফুল, লাল ছোপ ছোপ কাঁটামুকুট (Euphorbia milii) আর থোকায় থোকায় ফুটে থাকা রসুন লতা (Mansoa alliacea)। ছবিপ্রিয়দের জন্য একেবারে আদর্শ জায়গা।

ফ্রেশ হয়ে সকালের নাশতা সেরে আবার রওনা দিলাম, তবে এবার আর বাসে নয়, সাজেকের বাহন চান্দের গাড়িতে। ৪টা চান্দের গাড়িতে ৪ জন শিক্ষক আর আমরা মিলেমিশে উঠে পড়লাম। ওঠার আগে জানলাম, সাজেক থেকে ফেরার পথে আবার এই হোটেলেই উঠব। এমন সুন্দর একটা হোটেলে আবার থাকতে পাব শুনে মনে মনে একটু খুশিই হলাম।

চান্দের গাড়িতে মুহূর্তের মধ্যে শহর ছেড়ে সামনে এগিয়ে গেলাম। পাহাড়ের বুক চিরে আঁকাবাঁকা রাস্তা, রাস্তার ধারে মাঝেমধ্যে বাঁশ-কাঠের দু-একটা বাড়ি, সারি সারি কলাগাছ। যতই দেখি, ততই চেয়ে থাকি। গাড়িতে তখন বাজছে কৃষ্ণপক্ষ ব্যান্ডের তুহিন কান্তি দাসের গান “চান্দের গাড়ি”। এমন গান আর এমন প্রকৃতির মাঝে একসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টুরিস্ট ক্যাম্পে যাত্রাবিরতি হলো। সেখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে, আখের রস খেয়ে আবার রওনা দিলাম। তবে রওনা দেওয়ার আগে ঘটল এক মজার ঘটনা। চান্দের গাড়ির সামনে তিন-চারজন মিলে ছবি তুলছিল, তারা সবাই আর্জেন্টিনার সমর্থক, কেউ একজন বলে বসল, এটা আর্জেন্টিনা সমর্থকদের ফ্রেম। একে একে “আমিও আর্জেন্টিনা, আমিও আর্জেন্টিনা” বলে ফ্রেম ভরে গেল, শেষে স্যাররাও যোগ দিলে ফ্রেমটা একেবারে জমজমাট হয়ে উঠল। এই ঘটনায় সবাই খুব মজা পেয়েছিলাম।

বাঘাইহাটের ঢাল আর পাইলটের রোলার কোস্টার

আবার যাত্রা শুরু, আর পরের বিরতির আগ পর্যন্ত ফুটবলের এই রেশ চলল অবিরাম। পরের যাত্রাবিরতি বাঘাইহাট আর্মি ক্যাম্পে। সবাই চান্দের গাড়ি থেকে নেমে আশপাশ ঘুরে দেখা শুরু করলাম। হালকা টিলার মতো উঁচু জায়গার পাশে এই বিশ্রামের জায়গা, কিন্তু রোদের তাপে টিকে থাকাই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিল। আমাদের অনেকেই সাজেকে ঠান্ডা হবে ভেবে শীতের কাপড় নিয়ে এসে কিছুটা বেকায়দায় পড়ে গিয়েছিলাম। তবে চারদিকের সৌন্দর্যের কাছে এই গরম তুচ্ছ। কেউ হাঁটাহাঁটি শুরু করল, কেউ টিলার পাশে গাছের ছায়ায় বসে একটু জিরিয়ে নিল। আমাদের মতো আরও অনেক গাড়ি সেখানে অপেক্ষা করছিল, আর এই মানুষের আনাগোনা ঘিরে রাস্তার ধারে বেশ কয়েকটা ছোট দোকানও বসেছে। ফলমূল থেকে শুরু করে বাঁশের মগ, অল্প দামের নানা জিনিস অনেকেই কিনছে। আমিও ক্রেতাদের কাতারের একজন।

রাস্তার ধার ঘেঁষে পাহাড়ের ঢালটা একটু ভালোভাবে দেখতেই অনেক রকম টেরিডোফাইট নজরে পড়ল। বিশেষ করে মাটির ওপর ঘাসের মতো ছড়িয়ে থাকা সেলাজিনেলা (Selaginella sp.) একেবারে চোখে পড়ার মতো। প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো কিছু ম্যাকারাঙ্গা (Macaranga peltata) গাছ ঢালটাকে ছায়ায় ঢেকে রেখেছে, আর ক্যাম্পের চারপাশে লাগানো রেইনট্রি (Samanea saman) আর আকাশমণির (Acacia auriculiformis) দেখাও মেলে। ঢালুতে যে গাছটা আলাদা করে চোখে পড়ল, সেটা ভেরেন্ডা (Ricinus communis)। ফুল ফুটে থাকা অবস্থায় ছিল বলে কয়েকজন উদ্ভিদপ্রেমীর একটা ছোট ভিড়ও জমে গিয়েছিল সেখানে।

এভাবে এটা-সেটা দেখতে দেখতে অনেকটা সময় কেটে গেল। তারপর একদম বিরতিহীন পথচলা। সাজেকের পথে নতুন একটা জিনিস খেয়াল করলাম। যখনই কোনো চান্দের গাড়ি যাচ্ছিল, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ছোট বাচ্চাগুলো হাত নেড়ে টাটা দিচ্ছিল। বিষয়টা আমাকে খুব কৌতূহলী করে তুলল, একপর্যায়ে আমিও হাত নেড়ে তাদের টাটা দিতে লাগলাম। রাস্তার দুই ধারে উঁচু-নিচু পাহাড়, মাঝে মাঝে ছোট ছোট ঝরনা, ধার ঘেঁষে সেগুনের (Tectona grandis) বনায়ন, সব মিলিয়ে মন জুড়িয়ে যাচ্ছিল। সেগুনের ফাঁকে ফাঁকে আরেকটা গাছ চোখে পড়ে, ফুলঝাড়ু (Thysanolaena latifolia)। এই গাছের ফুল দিয়েই বাসাবাড়ি পরিষ্কারের ফুলঝাড়ু বানানো হয়।

ধীরেসুস্থে গেলে হয়তো সবকিছু আরও উপভোগ্য হতো, আরও অনেক কিছু দেখা যেত। কিন্তু আমাদের পাইলট (চান্দের গাড়ির ড্রাইভার) যে হারে গাড়ি টানছিল, মনে হচ্ছিল রোলার কোস্টারে বসে আছি। প্রথমে একটু অস্বস্তি লাগলেও আমাদের চারটা গাড়ির একটাকে পেছনে ফেলে সামনে যেতেই সবাই “পাইলট, পাইলট” বলে চিৎকার করে উঠল। সেই যে শুরু, আমরা স্লোগান দিয়ে পাইলটকে আরও উৎসাহ দিতে থাকলাম, আর সামনে থাকা গাড়িগুলোকে একে একে পেছনে ফেলে এগিয়ে চললাম। একে তো পাহাড়ি রাস্তা, তার ওপর একেবারে সরু, এই ওভারটেক করাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছিল। কিন্তু সবাই আনন্দ পাচ্ছিল, আর পাইলটকে বেশ দক্ষ মনে হলো, তাই ঝুঁকির কথা ভুলে আমিও আনন্দে যোগ দিলাম। একপর্যায়ে আমাদের দ্বিতীয় গাড়িকেও পেছনে ফেলে প্রথম গাড়ির ঠিক পেছনে চলে এলাম। সেটাকে পার করার আগমুহূর্তে পাইলট গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়ল। সবাই বলে উঠল, এটা কী হলো? তার হাতে একটা কাগজের প্যাকেট, পাশের দোকানে সেটা দিয়ে, কিছু কথাবার্তা বলে ফেরত এল। ততক্ষণে যতগুলো গাড়িকে পেছনে ফেলে এসেছিলাম, সবগুলো একে একে পার হয়ে গেল। সবাই কী কষ্টটাই না পেল। আমরা আশাবাদী ছিলাম, পাইলট আবার তার জাদু দেখাবে। কিন্তু না, সেদিন তো নয়ই, একেবারে শেষ দিন পর্যন্ত সে আর সামনের একটা গাড়িকেও ছাড়িয়ে যায়নি।

মেঘের দেশে প্রথম দিন

দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম সাজেকে। আমাদের বন্ধু রবিউলের পরিচিত একজন ছিলেন বলে দার্জিলিং রিসোর্টে আগেই বুকিং হয়েছিল। খুব সুন্দর, মনোরম পরিবেশ। রিসোর্টের পেছনে তাকালেই দূরদূরান্তের দৃশ্য, রাশি রাশি মেঘ আর সেই মেঘের জন্য মাটিতে আলো-ছায়ার খেলা, সবই চোখ জুড়ানো। হালকা ফ্রেশ হয়ে সবাই দুপুরের খাবার খেতে গেলাম। শহরে-গ্রামে আমরা সচরাচর যা খাই, মেনুতে তার চেয়ে ভিন্ন ধরনের আইটেম ছিল। ঝাল তুলনামূলক বেশি হলেও খাবার ছিল সুস্বাদু। তৃপ্তি নিয়ে খেয়ে রিসোর্টে ফিরে একটু বিশ্রাম, তারপর আবার রওনা কংলাক পাহাড়ের উদ্দেশে। এবার চান্দের গাড়ির ছাদে বসার অনুমতি মিলল, তাই বেশির ভাগ ছেলেই ছাদে বসে পুরোটা পথ হইহুল্লোড় করতে করতে গেলাম। কংলাক পাহাড়ের চূড়ায় উঠে চারপাশ দেখে ছবি তোলার ধুম পড়ে গেল। প্রথমে তেমন মানুষ না থাকলেও কিছুক্ষণের মধ্যে চূড়া মানুষে ভরে গেল, একজনের ছবি তুলতে গেলে আরও কয়েকজন ফ্রেমে চলে আসে, এমন অবস্থা। যে যার মতো ছবি তুলে সন্ধ্যা নামার আগেই কংলাককে বিদায় জানালাম।

ঠিক গোধূলির আলোয় আমরা হেলিপ্যাডে চলে এলাম, সবাই মিলে গোল হয়ে বসলাম। স্যার আহ্বান জানালেন, আমাদের মধ্যে যে গান পারে সে শুরু করুক, বাকিরা গলা মেলাবে। সিয়াম গান ধরল, বাকিরা তার সঙ্গে গলা মেলাল। সারা দিনের ক্লান্তিতে হালকা নাশতা করতে করতে গান শুনতে বেশ আরাম লাগছিল। রাতের খাবারের সময় হয়ে আসছিল, তাই আরও কিছুক্ষণ কাটিয়ে সবাই রিসোর্টে ফেরার জন্য তৈরি হলাম। হেলিপ্যাড থেকে রিসোর্ট সামান্য দূরে, তাই বেশির ভাগই হেঁটে এগোলাম। হেলিপ্যাড থেকে নেমেই বেশ কিছু খাবারের দোকান, রিসোর্টে যাওয়ার আগে সেখানে কী কী পাওয়া যায় একবার দেখতে গেলাম। নানা রকম খাবার, যার বেশির ভাগই শহরেও পাওয়া যায়। তাহমিনা ম্যাম সেখানে যারা ছিলাম তাদের মোমো আর ব্যাম্বু চিকেন খাওয়ালেন, সেই সৌভাগ্যবানদের মধ্যে আমিও একজন।

রিসোর্টে ফিরে গোসল সেরে রাতের খাবার খেতে গেলাম আবার সেই দুপুরের জায়গাতেই। কথামতো আমাদের বারবিকিউ পার্টির সবকিছু তারাই তৈরি রেখেছিল, আমরা শুধু গিয়ে খেয়ে এলাম। আগে ভেবেছিলাম সবাই মিলে নিজেরা বারবিকিউ করলে বেশি মজা হতো, কিন্তু শরীরের ক্লান্তির যা অবস্থা, তাতে এটাই ভালো হয়েছে। শিক্ষাসফরের শুরুতেই চন্দন স্যার বলেছিলেন, তিনি ইন্টারনেট খুঁজে, যারা আগে গেছে তাদের অভিজ্ঞতা জেনে, সবচেয়ে ভালো যা হয় তা-ই ঠিক করেছেন। এখন মনে হলো তিনি একদম সঠিক কথাই বলেছিলেন।

খাওয়াদাওয়া সেরে আজকের মতো বিরতি, আর কোনো পরিকল্পনা নেই, এটা ভাবতেও শান্তি লাগছিল। রিসোর্টে গিয়ে এদিক-সেদিক দেখাদেখি নেই, একদম বিছানায়। সেখানে ঘটল এক মজার ঘটনা। সাজেকের অন্য বাড়িগুলোর মতো দার্জিলিং রিসোর্টেরও সবকিছু কাঠের, তাই পাশের রুমের কথাবার্তা স্পষ্ট শোনা যায়। পাশের রুমের বন্ধুরা কী নিয়ে আলোচনা করছে শুনতে পেয়ে কাঠের দেয়ালে টোকা দিয়ে বললাম, পাশের রুমে সবকিছু ভালো তো? ওপাশ থেকে সাড়া এল, চলে। রাত যত গভীর হলো, শব্দ যেন আরও স্পষ্ট হতে থাকল। পাশের রুমের কারও নাক ডাকার শব্দ, এমনকি ওপরের তলায় চলাফেরার শব্দও কানে এসে ঝাঁকি দিচ্ছিল। তবে ক্লান্ত শরীরে কোনো শব্দই আর বাধা হলো না, কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম বুঝতেই পারলাম না।

উপন্যাস অ্যাভাটার

লিখেছেন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।