গিয়েছিলাম খালাতো ভাইয়ের বাসায়। আসার পথে হঠাৎ অচেনা একটা গাছ চোখে পড়ল, তাই পরের দিন, মানে গত পরশু, সকাল সকাল বের হয়ে পড়লাম তার সঙ্গে দেখা করব বলে। একটু কেমন যেন লাগছিল, কারণ সঙ্গে নেওয়ার মতো কেউ নেই, এমনকি জামানও নেই। একা একাই যেতে হলো। তারপরও সময়টা ভালোই কেটেছিল।
পলাশ, শিমুল আর কাঠবাদাম
প্রথমে রামপুরা ব্রিজ থেকে হাতিরঝিল চক্রাকার বাসে উঠে একদম শেষ মাথায় এসে নামলাম। তারপর হেঁটে হেঁটে পুরোটা ঘুরে ঘুরে দেখা শুরু হলো। শুরুতেই দেখা পেলাম পলাশ আর শিমুলের, তারপর কাঠবাদামের। কাঠবাদামের পুরো গাছগুলো জুড়ে একদম ফুলে ফুলে ভরে আছে, দেখতে ভালোই লাগছিল। রাস্তার ফুটপাত ধরে যত এগোতে থাকলাম, ঝিলের পাড় ঘেঁষে বেশ কিছু মেহগনি গাছ পেলাম, সঙ্গে আছে খেজুরগাছ। এখানে আরও যেগুলো চোখে পড়ে তা হলো হিজল গাছ, আর মাঝে মাঝে মহুয়া।
হলুদের রাজত্ব আর ললিপপ ঝাউ
কিছুটা পথ যেতেই হলুদে হলুদে যার প্রভাব বিস্তার, সে হলো রানিচূড়া। ও হ্যাঁ, এখানে আবার অনেক জায়গায় রাধাচূড়াও উপস্থিত। তারপর এল একটা ফ্লাইওভার। তার ধার ধরে ঝাউগাছের ললিপপের মতো অবয়ব একদম শেষ প্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে, আর তাদের ফাঁকে ফাঁকে বাগানবিলাস। তারপর শুরু হলো কামিনী আর কাঞ্চনের খেলা, সঙ্গে দেবকাঞ্চনও আছে। একের পর এক ক্রমে ক্রমে তাদের দেখতে মজাই লাগছিল। কাঠগোলাপের (Plumeria obtusa) নানা রকম বাহারও নজর কাড়ল।
আগুনের ফুলকি আর কমলার থোকা
আরেকটু পথ যেতেই আরেকটা ফ্লাইওভার। তার আশপাশে শুধু বোতলব্রাশ আর বোতলব্রাশ। সবগুলো গাছেই বেশ ভালো ফুল ধরেছে, দেখে মনে হচ্ছিল যেন আগুনের ফুলকি গাছের ওপর ছিটেফোঁটা হয়ে পড়েছে। আর এখানে কাঁটামেহেদির ফলগুলো সত্যিই আমাকে মুগ্ধ করেছে, কারণ এভাবে আমি এর ফল আগে কোনো দিন দেখিনি। প্রথমে মনে হয়েছিল, থোকায় থোকায় পাকা কমলালেবু ধরে আছে।
শেষ প্রান্তে একটু হতাশা
তবে শেষ প্রান্তে এসে আরেকটা ফ্লাইওভার। প্রথমে একটু হতাশ হয়েছিলাম, কারণ দেখলাম কিছু কাঞ্চন গাছ আর কিছু বোতলব্রাশের গাছ পর পর খুব কাছাকাছি লাগানো আছে। কাঞ্চনের সাদা সাদা ফুলের সঙ্গে বোতলব্রাশের পাতা পাশাপাশি দেখে হয়তো সেদিন মনে করেছিলাম, নতুন একটা গাছ দেখেছি। সত্যিই মনটা একটু খারাপ হয়েছিল, কারণ ঘণ্টাখানেক হেঁটে ক্লান্ত হয়ে যা চাইলাম, যার দেখা পাওয়ার আশায় ছিলাম, সে বাস্তবে নেই। তারপরও হতাশার কিছু নেই, পুরোটাই খুব উপভোগ করেছি। না না, শেষ না, এখনো কিছু বাকি আছে।
সেদিন ভুল দেখিনি
ফিরে আসতে আসতে ফ্লাইওভারের পাশেই হঠাৎ চোখে পড়ল সেদিনের দেখা সেই গাছগুলো। গাছটা বোতলব্রাশের মতো, আর সাদা সাদা ফুল থোকায় থোকায় ঝুলে আছে। অনেক অনেক ছবি তুলেছি এর। আমার ছবি তোলা দেখে একজন পাশ দিয়ে যেতে যেতে জিজ্ঞাসাই করে বসলেন, ভাই, গাছটার নাম কী? আমি নামই বলতে পারলাম না, এটা আমার জন্য একটু লজ্জাজনক। তবে হ্যাঁ, তখন গাছটাকে আমার কাছে অনেক দামি মনে হচ্ছিল, কারণ সে আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল, আমার অনুমান সঠিক ছিল, সেদিন ভুল দেখিনি।
যাই হোক, পুলিশ প্লাজার কাছাকাছি এসে এতটাই ক্লান্ত লাগছিল যে বাধ্য হয়ে আবার চক্রাকার বাসে উঠে রামপুরা ব্রিজের স্টপেজে ফিরে এলাম। বাসার দিকেই রওনা দিচ্ছিলাম, কিন্তু কী আর করার, যাওয়ার পথে স্টপেজের কাছেই কিছু বান্দরলাঠি (Cassia grandis) গাছ দেখেছিলাম। একটু একটু করে, খুব ধীরে ধীরে তাদের কাছে গিয়ে দুই-চারটা ছবি তুলে ফিরে এলাম বাসায়। আর আমার এই ভ্রমণের নায়ক, যার জন্য সেদিন হাতিরঝিলে গিয়েছিলাম, তার পরিচয় পেলাম শ্রদ্ধেয় জসিম স্যারের কাছে। তাঁকে কিছু ছবি দিয়েছিলাম, তিনিই পরিচয় দিলেন, গাছটার নাম Callistemon pallidus (Bonpl.) DC.
সেদিন যাদের দেখা পেলাম
- পলাশ, Butea monosperma
- শিমুল, Bombax ceiba
- কাঠবাদাম, Terminalia catappa
- হিজল, Barringtonia acutangula
- রানিচূড়া, Senna polyphylla
- খেজুর, Phoenix sylvestris
- বাগানবিলাস, Bougainvillea spectabilis
- শ্বেতশিমুল, Ceiba pentandra
- কামিনী, Murraya paniculata
- শ্বেত রক্তকাঞ্চন, Bauhinia variegata var. candida
- দেবকাঞ্চন, Bauhinia purpurea
- বোতলব্রাশ, Callistemon citrinus
- কাঁটামেহেদি, Duranta repens

মন্তব্য করুন