সোনালি ব্যাগ: দূষণমুক্ত পরিবেশের নতুন চাবিকাঠি

উপন্যাস অ্যাভাটার
পড়তে ৬ মিনিট
এই লেখায়

প্লাস্টিক নিয়ে আগের পোস্টগুলোতে অনেক কথা বলেছি। প্লাস্টিক কীভাবে আমাদের পরিবেশের ক্ষতি করছে, আর এর থেকে মুক্তির উপায় কী হতে পারে, সেসব নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সেখানে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক আর সোনালি ব্যাগের কথা বলেছিলাম। তখন আপনারা অনেকেই সোনালি ব্যাগ নিয়ে নানা প্রশ্ন করেছিলেন, কোথায় পাওয়া যায়, দাম কত, ব্যবহার করে কেমন লাগে ইত্যাদি। সোনালি ব্যাগ সম্পর্কে তখন খুব বেশি জানতাম না বলে কাউকেই আশাব্যঞ্জক কোনো উত্তর দিতে পারিনি। আজ সেই ঋণ কিছুটা শোধ করার চেষ্টা করি।

GNOBB বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বেশ কয়েকটি সেমিনারের আয়োজন করেছে। গত ২৬ জুন ২০২১ তারিখে সোনালি ব্যাগ নিয়ে একটি সেমিনার ছিল, আর কথা বলেছেন স্বয়ং সোনালি ব্যাগের আবিষ্কারক ড. মোবারক আহমদ খান স্যার। তাঁর মুখ থেকেই সোনালি ব্যাগের ইতিহাস শুনতে পেরে খুব আনন্দ হয়েছে, পাশাপাশি আমার যত প্রশ্ন ছিল সবগুলোর উত্তরও পেয়ে গেছি। আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। এই সেমিনারে না থাকলে হয়তো অনেক কিছুই অজানা থেকে যেত। যাঁরা অংশ নিতে পারেননি, মূলত তাঁদের কথা ভেবেই এই লেখা, যেন তাঁরাও কিছুটা হলেও জানতে পারেন।

প্লাস্টিকের গুণই প্লাস্টিকের দোষ

সোনালি ব্যাগের কথা বলার আগে প্লাস্টিক নিয়ে দুটো কথা না বললেই নয়। প্লাস্টিক এমন এক পদার্থ যা পানি, তাপ আর পোকামাকড় প্রতিরোধী, গলে না, পচে না, নষ্ট হয় না, বছরের পর বছর কোনো সমস্যা ছাড়াই ব্যবহার করা যায়। এই গুণগুলোর জন্যই প্লাস্টিকের ব্যবহার সর্বত্র, আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজের সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। দুঃখের বিষয়, ঠিক এই গুণগুলোর কারণেই প্লাস্টিক আজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। মাটিতে, পানিতে, যেখানেই তাকাবেন প্লাস্টিকের অস্তিত্ব আছে, কারণ স্বাভাবিকভাবে এরা কোনোদিনই ক্ষয় হয় না। এভাবে চলতে থাকলে সেদিন হয়তো বেশি দূরে নয়, যেদিন প্লাস্টিকের কারণে পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে।

এই অক্ষয় গুণের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার আশায় বিজ্ঞানীরা বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক তৈরি করেছেন। দেখতে আর কাজে এটি প্লাস্টিকের মতোই, কিন্তু মাটির নিচে রেখে দিলে অন্য সব জিনিসের মতো একদিন মাটিতে মিশে যায়। তবু বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক আসলে প্লাস্টিকেরই আরেক সংস্করণ, তাই প্লাস্টিকের কিছু ক্ষতিকর দিক এতেও থেকেই যায়।

পাট কেন

ড. মোবারক আহমদ খান স্যারের চিন্তা ছিল একদম নতুন কিছু থেকে এমন একটা ব্যাগ বানানো, যা দেখতে আর কাজে প্লাস্টিকের বিকল্প হতে পারে। প্রথমে এল নানা রকম ভাবনা, তারপর এল উপায়। আমাদের আশপাশের পচনশীল জিনিস থেকেই যদি ব্যাগ বানানো যায়, তাহলে কেমন হয়? উদ্ভিদের দেহে স্টার্চ আর সেলুলোজ, এই দুই ধরনের পদার্থ লম্বা শিকলের আকারে থাকে। তিনি মূলত সেলুলোজের কথাই ভাবছিলেন।

কিন্তু গাছের কাণ্ড থেকে সেলুলোজ নিতে গেলে সেই কাণ্ড তৈরি হতেই সময় লেগে যায় প্রায় ১৫ বছর, যা মোটেও লাভজনক নয়। তাই তিনি বেছে নিলেন পাট। পাটের আঁশে থাকে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ সেলুলোজ, যা অন্য উদ্ভিদের তুলনায় অনেক বেশি, আর মাত্র দুই-চার মাসের মধ্যেই এই আঁশ ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠে। তার ওপর আমাদের দেশে পাট খুবই সহজলভ্য, ফলে কাঁচামালের খরচও অনেক কমে আসে। সেই ভাবনা থেকেই স্যার আর তাঁর সহকর্মীরা সরকারের সহযোগিতায় সোনালি ব্যাগের কাজ শুরু করেন, এবং সীমিত পরিসরে এর উৎপাদনও সফল হয়েছে।

সোনালি ব্যাগের বিশেষত্ব

সোনালি ব্যাগ প্লাস্টিকের মতোই হালকা আর পাতলা, কিন্তু প্লাস্টিকের চেয়েও বেশি ভার বহন করতে পারে, আর খুব সহজেই পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায়। একটি সোনালি ব্যাগ মাটির নিচে রেখে দিলে মাত্র ১২০ দিনের মধ্যেই পুরোপুরি মিশে যায়, এর কোনো অস্তিত্বই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আরও ভালো দিক হলো, পোড়ালে এটি প্লাস্টিকের মতো গলে যায় না, কাগজের মতো ছাই হয়ে যায়। পানিতে কিছুদিন থাকলেও ক্ষয় হয়ে যায়। অর্থাৎ সোনালি ব্যাগ ব্যবহার করলে পরিবেশের ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। এটি বাংলাদেশের একটি বড় আবিষ্কার, আমাদের দেশের বড় একটি অর্জন। স্যার জানালেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDG) ১৭টি লক্ষ্যের মধ্যে প্রায় ৬ থেকে ৭টি পূরণে সোনালি ব্যাগ ভূমিকা রাখতে পারে, যা সত্যিই অভাবনীয়।

তাহলে বাজারে পাওয়া যায় না কেন

এতকিছু শুনে হয়তো মনে মনে বলছেন, সোনালি ব্যাগের কথা তো বছরখানেক ধরেই শুনছি, এত উপকারী জিনিস হলে এতদিনেও বাজারে পাওয়া যায় না কেন? সেমিনার শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বে যিনিই সুযোগ পেয়েছেন, ঘুরেফিরে এই একটা প্রশ্নই করেছেন। স্যার উত্তর দিয়েছেন খুব সাবলীল ভাষায়।

তিনি বললেন, তিনি শুধু আবিষ্কার করেছেন আর সীমিত পর্যায়ে উৎপাদন করেছেন। এক লক্ষ ব্যাগ উৎপাদনের কথা বললেন, কিন্তু সেটাকে আর যা-ই হোক, বাণিজ্যিক উৎপাদন বলা চলে না। তাঁর কথায়, “আমি বিজ্ঞানী, কীভাবে এটি উৎপাদন করা যায় সেই পথ আমি দেখিয়ে দিয়েছি, এখন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন তো আর আমার পক্ষে সম্ভব না।” মজা করে এটাও বললেন, নিজের আর্থিক ব্যবস্থা থাকলে যে করতেন না, এমনও না।

এর পাশাপাশি সোনালি ব্যাগ নিয়ে কত সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে, তার অনেক কথাও বেরিয়ে এল। প্রধান সমস্যা ছিল যন্ত্র নিয়ে। সোনালি ব্যাগ তৈরির যে যন্ত্র দরকার ছিল তার দাম চাওয়া হয়েছিল ২৫ কোটি টাকা। স্যার নিজের দূরদর্শিতা আর সৃজনশীলতায় বিভিন্ন অংশ জোড়া দিয়ে নিজেই একটা যন্ত্র বানিয়ে ফেলেন, ফলে সেই খরচ নেমে আসে লাখ টাকায়। এটা না পারলে হয়তো সোনালি ব্যাগের উদ্ভাবনই কখনো সম্ভব হতো না।

প্রশ্নোত্তর পর্বের সেই উত্তর

যেকোনো সেমিনারে উপস্থাপনায় যতটুকু তথ্য পাওয়া যায়, প্রশ্নোত্তর পর্বে পাওয়া যায় তার চেয়ে অনেক বেশি। তাই উপস্থাপনার সময় যতটা মনোযোগ দিয়ে শুনি, প্রশ্নোত্তর পর্বে আমি তার চেয়েও বেশি মনোযোগী হই। হঠাৎ এ কথা বলার কারণ একজনের প্রশ্ন আর তার উত্তরে স্যারের কথাগুলো। প্রশ্নটা ছিল, কেন এখনো বাণিজ্যিকভাবে সোনালি ব্যাগ উৎপাদনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না, সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে তো এটা শুরু করা যেতে পারে, প্রাথমিকভাবে তো মাত্র ৩-৪ কোটি টাকা লাগবে, যা একজন কারখানা মালিকের কাছে খুব বড় কিছু না। তা ছাড়া পরিবেশ নিয়ে সচেতন দেশগুলোর তো এতদিনে এটা নিয়ে উৎপাদন শুরু করে দেওয়ার কথা, সেটাও হচ্ছে না কেন? স্যার যে উত্তর দিলেন, শুনে একটু হতভম্বই হলাম।

তিনি বললেন, সোনালি ব্যাগ একদম নতুন একটা জিনিস, তাই কেউ সহজে বাণিজ্যিক উৎপাদনের ঝুঁকি নিতে চাইবে না। যে যন্ত্র দিয়ে তিনি ব্যাগ বানাচ্ছেন তাতে দিনে হয়তো ৩০০ থেকে ৪০০টি ব্যাগ বানানো সম্ভব, কিন্তু বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য এই যন্ত্র চলবে না। এতে আরও পরিবর্তন আনতে হবে, নতুন পরিকল্পনা লাগবে, যা একা তাঁর পক্ষে সম্ভব না। আরেকটা বিষয় হলো দাম। উৎপাদন খরচের কারণে সোনালি ব্যাগের দাম প্লাস্টিকের চেয়ে একটু বেশি পড়ে। সাধারণ মানুষ প্লাস্টিকের বদলে বেশি দাম দিয়ে সোনালি ব্যাগ কিনবে কি না, সেটাও ভেবে দেখার বিষয়।

তা ছাড়া প্লাস্টিক বহু বছরের বিশাল এক ব্যবসা। এত বড় আর এত পুরোনো একটা বাজারে নতুন একটা পণ্যের জায়গা করে নেওয়া যতটা সহজ মনে হয়, বিষয়টা ততটা সহজ না, এর সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত। তবে হ্যাঁ, পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা বাড়লে হয়তো কোনো একদিন বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হবে। সেই দিন হয়তো বেশি দূরে নয়।

এখনই যেভাবে কেনা যায়

শেষ কথায় অবশ্য একটা আশার আলো ফুটে উঠল। আমরা চাইলে কিন্তু এখনই সোনালি ব্যাগ কিনতে পারি। এই লেখা পর্যন্ত, ফার্মগেটের পাশে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যে ভবনটি আছে, সেখানে সোনালি ব্যাগ পাওয়া যাচ্ছে। হয়তো আপনার আমার মতো কয়েকজন পরিবেশ সচেতন মানুষের ছোট ছোট উদ্যোগ থেকেই ভবিষ্যতে বড় পরিবর্তন আসবে। “প্লাস্টিকের ব্যবহার যথাসাধ্য কমিয়ে আনি, পরিবেশকে দূষণের হাত থেকে রক্ষা করি”, এই স্লোগান দিয়েই আজকের লেখা শেষ করছি।

উপন্যাস অ্যাভাটার

লিখেছেন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।