বোটানি-৬৫ শিক্ষাসফর ২০২২ (পর্ব ২): সাজেকের ভোর থেকে আলুটিলার আঁধারে

উপন্যাস অ্যাভাটার
পড়তে ১১ মিনিট
এই লেখায়

এই শান্তির ঘুম ভাঙল একেবারে পরদিন সকালে। চন্দন স্যার বলে দিয়েছিলেন, সূর্যোদয় দেখতে চাইলে সকাল ৬টার মধ্যে হেলিপ্যাডে থাকতে হবে, দেরি করলে আর দেখা যাবে না, সূর্য কারও জন্য অপেক্ষা করে না। কথামতো সকালে সবাই হেলিপ্যাডে হাজির। অনেক দিন পর এমন সূর্যোদয় দেখলাম। সূর্য যে এত দ্রুত ওঠে, সেটাও উপভোগ করার মতো, দেখতে দেখতে তার আলো চারদিক আলোকিত করে ছড়িয়ে পড়ল।

লুসাই গ্রাম আর মাইটোকন্ড্রিয়ার মতো প্যাঁচানো পথ

সেখানে আরও কিছুক্ষণ থেকে পাশের লুসাই গ্রাম দেখতে গেলাম। অল্প জায়গার মধ্যে খুব সুন্দরভাবে তাঁরা নিজেদের ঐতিহ্য তুলে ধরেছেন সেখানে। অনেকে তাঁদের পোশাক পরে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর আবুল কাশেম স্যার আর মিহির লাল সাহা স্যার এলেন। মিহির স্যার লুসাই গ্রাম আর জাপানি সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ একটা আলোচনা করলেন, আমরা মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। ওখানে যে লাইকেনের একটা প্রতিপত্তি আছে, সেটাও স্যারই প্রথম আমাদের দেখালেন। তারপর চারদিক ঘুরে দেখে সকালের নাশতার জন্য আবার রিসোর্টের দিকে রওনা দিলাম। হেঁটে ফেরার পথে কিছু সাইকাস (Cycas) গাছ চোখে পড়ল। নাশতা সেরে সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে দার্জিলিং রিসোর্টকে বিদায় জানিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম নতুন কিছু দেখার উদ্দেশে। এবারের গন্তব্য খাগড়াছড়ি শহর।

পাহাড়ের ঢেউয়ের সঙ্গে ঢেউ মিলিয়ে দোল খেতে খেতে চলছে চান্দের গাড়ি। গত দিনের চেয়ে আজকের পথটা যেন আরও বেশি উপভোগ করছি। সাজেকের রাস্তার একটা বিশেষ গুণ হলো, আমরা কোথায় যাব সেটা বহুদূর থেকে দেখা যায়, এমনকি বেশ কাছেও মনে হয়, কিন্তু রাস্তাটা মাইটোকন্ড্রিয়ার মতো প্যাঁচানো। গাড়ি ডানে যায়, বামে যায়, ঘুরে যায়, তারপর বোঝা যায় অনেকটা পথ পেরিয়েও আগের জায়গা থেকে সামান্যই এগিয়েছি। এভাবে একটু একটু করে সাজেককে পেছনে ফেলে খাগড়াছড়ির দিকে এগিয়ে চললাম।

যেতে যেতে গত দিনের মতো আজও বাচ্চাগুলো টাটা দিচ্ছিল। হঠাৎ সামনের গাড়ি থেকে এক ভদ্রলোক বাচ্চাগুলোর দিকে একটা ১০ টাকার নোট ছুড়ে দিলেন। সেই নোটের পেছনে বাচ্চাগুলোর দৌড়ে যাওয়া দেখে সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভ্রমণকাহিনি “পালামৌ”-এর সেই ঘটনাটা মনে পড়ে গেল, নদী পার হওয়ার সময় বাচ্চাদের টাকা দেওয়ার ঘটনা। খুব সুন্দর একটা কাহিনি ছিল সেটা। তবে এখানে বাচ্চাগুলো চারদিকে না তাকিয়ে যেভাবে টাকার পেছনে ছুটছিল, যেকোনো সময় বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। এসব ভাবতে ভাবতেই খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছে গেলাম। সেখানে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানিসহ নানা দলের পতাকা দেখে কিছুটা অবাকই হলাম, খেলার ছোঁয়া তাহলে পুরো দেশ জুড়েই লেগেছে। সেদিন রাতে ছিল ব্রাজিলের খেলা, যার রেশ মাঝে মাঝে পাওয়া যাচ্ছিল। এসব দেখতে দেখতে গত দিনের সেই হোটেল ইকোছড়ি ইনে পৌঁছে গেলাম।

জুম্মার দৌড় আর রিসাং ঝরনার সিঁড়ি

সেদিন ছিল শুক্রবার। গাড়ি থেকে নেমেই আমরা কয়েকজন জুম্মার নামাজের জন্য মসজিদের দিকে দৌড় দিলাম। কিন্তু দেড়টা বেজে যাওয়ায় মাঝরাস্তায় আমাদের মধ্যে দুই দল হয়ে গেল। এক দল বলে, সময় তো শেষ, ফিরে যাই, গোসল করে ফ্রেশ হয়ে না হয় নামাজটা পড়ব। আরেক দল বলে, প্রায় চলেই তো এসেছি, নামাজটা পড়েই যাই। কী করলে ভালো হয় ভাবতে ভাবতেই মসজিদের সামনে হাজির। সময় পেরিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু খুতবা চলছে, তার মানে এখনো আশার আলো আছে। তাড়াহুড়ো করে অজু করে নামাজে যুক্ত হতে পেরেছিলাম। আশাবাদী হতে হবে আর শেষ পর্যন্ত লেগে থাকতে হবে, সেদিন এই দুটো শিক্ষা পেলাম। পরে হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবার খেলাম। এই হোটেলের রান্না সত্যিই চমৎকার। তৃপ্তি নিয়ে খেয়ে একটু বিশ্রাম, তারপর আবার রওনা, এবার খাগড়াছড়ির বিখ্যাত রিসাং ঝরনা দেখতে।

সেই পাইলটের চান্দের গাড়ির ছাদে বসে চারদিক দেখতে দেখতে চললাম। মজার বিষয়, আমাদের গাড়ির ১২ জনের ১০ জনই ছাদে, ভেতরটা ফাঁকা বললেই চলে। অবশ্য ফেরার সময় রাত হয়ে গিয়েছিল বলে সবাই নিচেই বসে এসেছিলাম। চান্দের গাড়ি আমাদের রিসাং ঝরনার ওপরের একটা জায়গায় নামিয়ে দিল। আমরা দল বেঁধে একে একে নিচে নামা শুরু করলাম। নামার এই রাস্তাটা ভীষণ ঢালু, দেখতে বেশ ভয়ংকর, তাই অনেকেই আর নামল না, ওপরেই থেকে গেল। পাহাড়ের গা ঘেঁষে খাঁজকাটা কংক্রিটের পথ, সেটাও অনেক ঢালু, দেখলেই বোঝা যায় ঝরনাটা অনেক নিচে। ধীরেসুস্থে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে পাহাড়ের গায়ে চোখ পড়ল। একটু ভালোভাবে তাকালে সেখানে ফার্ন আর সেলাজিনেলার (Selaginella) আস্তরণ বোঝা যায়। সেগুলো দেখতে দেখতে একদম নিচে ঝরনার কাছে পৌঁছে গেলাম। হোটেল থেকে বেরোতে একটু দেরি হয়েছিল বলে ঝরনার কাছে যেতেই সূর্যের আলো কমে এল।

স্যার ম্যামরা ফেরার জন্য সবাইকে তাগাদা দেওয়া শুরু করলেন। সমস্যা তো এটাই, যত আরামে নেমেছিলাম, তত কষ্ট করে এবার উঠতে হবে। আমি দেরিতে নেমেছিলাম, ছিলাম সবার পেছনে, তাই দৌড়ে সবার সামনে যাওয়ার চেষ্টা করলাম, আর সেটা ছিল আরেক বোকামি। অল্প দৌড়েই হাঁপিয়ে উঠলাম, বাকি পথ কোনোরকমে একটু একটু করে উঠে এলাম। সেখানে বাইকের ব্যবস্থা ছিল, কিছু টাকার বিনিময়ে সোজা ওপরে উঠে আসা যায়, কিন্তু কেউই সেই ঝুঁকি নিতে আগ্রহী ছিল না। সবাই হেঁটেই ওপরে উঠলাম। ওপরে বন বিভাগের একজন কর্মকর্তা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমরা নির্মাণাধীন রেঞ্জ অফিসে গেলাম। প্রধান কর্মকর্তা আমাদের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগেরই একজন বড় ভাই। সেদিন ছিল ২ ডিসেম্বর, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির ২৫ বছর পূর্তি, তাই সেখানে একটা অনুষ্ঠানেরও আয়োজন হয়েছিল। এত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি আমাদের সময় দিয়েছেন, এটা সত্যিই আনন্দের।

এই সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে আবার হোটেলে ফিরে এলাম। তবে চান্দের গাড়িতে এটাই ছিল আমাদের শেষ যাত্রা। সুকাশ দাদার সঙ্গে ছবি তুলে তাঁকে বিদায় জানালাম। দুই দিন ধরে তাঁর গল্প বলে গেলাম, কিন্তু পাইলটের নামটা মনে হয় এই প্রথম বললাম। কাল থেকে আবার বাসে যাত্রা, চান্দের গাড়ি আর পাব না, এই কথাটা কেমন যেন মনের মাঝে আটকে গেল। কিন্তু সবই নিয়তি, মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

ইকোছড়ির শেষ রাত

যে যার রুমে ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবারের জন্য তৈরি, ডাক পড়তেই হোটেলের চারতলায় সবাই হাজির। এই হোটেলের খাবার সত্যিই দারুণ। মজা করে খেয়ে হালকা বিশ্রাম নিয়ে কেউ রুমে চলে গেল, কেউ হোটেলের নিচে গল্প করতে, আর কেউ সেখানেই বসে আরও কিছুটা সময় কাটাল। কয়েকজনের একটা দল হোটেলের আশপাশে হাঁটতে বেরোল, তাদের পিছু পিছু আমিও গেলাম। খুব সুন্দর নিরিবিলি পরিবেশ, কোথাও তেমন কেউ নেই, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক স্পষ্ট শোনা যায়। কিছুটা পথ যেতেই একটা টঙের মতো দোকান, সেখানে আমাদের আগেই আরেকটা দল এসে বসেছে। আমরা তাদের চায়ের আড্ডায় যোগ দিলাম, বেশ ভালো লাগছিল। এই উপভোগ্য পরিবেশ ছেড়ে পরে সবাই হোটেলে ফিরে এলাম। স্যার ম্যাম আর বাকি সবাই হোটেলের নিচে অপেক্ষা করছিলেন। এই সফরে আমরা কী শিখলাম, কী দেখলাম, এই নিয়ে সেখানে ছোটখাটো একটা ক্লাস হয়ে গেল।

ক্লাস শেষে যে যার রুমে। ভাবলাম শান্তির ঘুম হবে, কিন্তু রুমের টিভিটার দিকে নজর যেতেই সেই চিন্তা উবে গেল। আমি খেলাপ্রিয়, কিন্তু যাদের সঙ্গে ছিলাম তারা কট্টর খেলাপন্থী। সেদিন ব্রাজিলের খেলা রাত ১টায়, তারা যেকোনো মূল্যে খেলা দেখবেই। কিন্তু কেন যেন টিভিটা কাজ করছিল না, তাদের জন্য দুঃখ হলেও নিজের জন্য কিছুটা শান্তি পেলাম। ভাবছিলাম তারা হয়তো পাশের রুমে খেলা দেখতে চলে যাবে, কিন্তু ওরা আর্জেন্টিনার ভক্ত, তাই সেটা আর হয়নি। মোবাইলে মাঝে মাঝে স্কোর দেখে নিচ্ছিল। ততক্ষণে আমি ঘুমের জগতে হাবুডুবু খেতে শুরু করেছি, আর এই জগতের বাসিন্দা হিসেবে টিকে থাকতে পারলাম না।

সকালে ঘুম ভাঙতেই রাসিফ বলল, ভাই, রাত জেগে খেলা না দেখে ভালোই হয়েছে, ব্রাজিল হেরেছে। পাশে থাকা রাকিবও বলে বসল, হ্যাঁ ভাই, ভালো হয়েছে, খেলা তেমন জমেনি। বাহ, সকালে মানুষ পাখির ডাক শুনে ঘুম থেকে ওঠে, সুপ্রভাত শোনে, আর আমি শুনি খেলার খবর, ভালোই। তাহলে আজ আমাদের একটা দল নীরবতা পালন করবে। বাস্তবে হলোও তা-ই। নাশতার ডাক পড়লে সবাই দলে দলে চারতলায় উঠে এলাম। তাদের কাছে যেতেই বোঝা যাচ্ছিল, তারা কিছুটা নিশ্চুপ, কিছুই বলছে না। তবে খেতে খেতে একপর্যায়ে কেউ একজন খেলা নিয়ে কিছু বলে উঠতেই সবার মাঝে কথা শুরু হলো, ধীরে ধীরে পরিবেশ স্বাভাবিক হলো। আজকের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হলো। নাশতা শেষে ব্যাগ-বস্তা গুছিয়ে পছন্দের হোটেল ইকোছড়ি ইনকে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় জানালাম। মিহির স্যার দিকনির্দেশনামূলক কিছু কথা বললেন, তারপর সবাই মিলে স্মৃতি হিসেবে একটা গ্রুপ ছবি তুলে আমাদের জন্য অপেক্ষারত বাসের দিকে হাঁটা শুরু করলাম।

হর্টিকালচার পার্কের নাটা থেকে আলুটিলার অন্ধকারে

আজকের শেষ গন্তব্য রাঙামাটি, তবে পথে হর্টিকালচার পার্ক আর আলুটিলা গুহা দেখে রাতে রাঙামাটিতে থাকব। বাসে হইহুল্লোড় করতে করতে খুব দ্রুতই হর্টিকালচার পার্কে পৌঁছে গেলাম। সকাল সকাল বলে গুটিকয়েক ছাড়া আর কোনো পর্যটক ছিল না; বেশি দেরি হলে ভিড়ে টেকা যেত না। আমরা খুব আরামে চারদিক ঘুরে দেখার সুযোগ পেলাম। ঝুলন্ত ব্রিজ পার হয়ে ভেতরে যেতেই পরিবেশটা যেন পাল্টে গেল, কী নিরিবিলি আর শান্ত। চেনা-পরিচিত গাছপালার পাশাপাশি বেশ কিছু দুর্লভ গাছের দেখা পেলাম। সাজেকের মতো এখানেও ফার্ন আর লাইকেনের জোরালো উপস্থিতি লক্ষ করার মতো। এ ছাড়া রাস্তার দুই ধারে সাজসজ্জার জন্য চোখ জুড়ানো বেশ কিছু ফুলের গাছও লাগানো। ধীরে ধীরে সামনে যেতে যেতে হঠাৎ দেখি আবার সেই ঝুলন্ত ব্রিজের সামনে। জায়গাটা এমনভাবে সাজানো যে দুটো পথের একটা দিয়ে গেলে আরেকটা দিয়ে ফিরে আসা যায়।

আশপাশে আরও কিছুক্ষণ ঘুরে আবার রওনা দিলাম। ফেরার পথে রাস্তার ধারে নাটা গাছের ফলের দেখা পেলাম। এই নাটা গাছের ফুল দেখেছিলাম সাজেকের দার্জিলিং রিসোর্টের পাশে, এতক্ষণে যেন গাছটার পূর্ণাঙ্গ রূপ ফুটে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালীর কিশোর সংস্করণ “আম আঁটির ভেঁপু”-তে নাটা ফলের বীজ নিয়ে খেলার কথা। এই নাটা সেই নাটা কি না, তা নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় পড়লাম। পরিপক্ব বীজ পাওয়া যায় কি না চারদিকে একটু খুঁজে দেখলাম, কিন্তু চোখেও পড়ল না, সময়ও জুটল না। তাই আবার দেখা হবে, এই আশা রেখে বাসে গিয়ে বসে পড়লাম।

এবার যাব আলুটিলা গুহায়। সবাই এই গুহায় যাওয়ার জন্য এত আগ্রহী যে তাদের উচ্ছ্বাস গানের তালে তালে বোঝা যাচ্ছিল। গান আর প্রকৃতি দেখতে দেখতে কখন যে গুহার সামনে এসে হাজির হলাম, বুঝতেই পারলাম না। বাস থেকে নেমেই গুহার দিকে হাঁটা শুরু। পাহাড়ের গা কেটে মনোরম রাস্তা, তার পাশে গাছপালার সাজানো সারি, সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে ভালোই লাগছিল। রাস্তার মাঝের বটগাছটা ছিল একেবারে নজরকাড়া, তার ঝুরিগুলো এত সুন্দরভাবে ঝুলে ছিল যে দেখেই মন পুলকিত হয়ে উঠল। তবে সময়ের অভাবে স্যার আগেই বলে দিয়েছিলেন কোথাও যেন না থামি, তাই একদম গুহার মুখের সামনে গিয়ে হাজির হলাম। সেখানে গিয়ে হঠাৎ মাটির দিকে নজর গেল। এমন সুন্দর কারুকার্যময় মাটি আগে কখনো দেখিনি, যেন কেউ রংতুলি দিয়ে মনের মতো করে ছবি এঁকে রেখেছে। সবাই একে একে গুহায় ঢুকছে, এবার ভেতরে যাওয়ার পালা।

আমি ভেবেছিলাম পাহাড়ের মাঝে ফাটল হলে যেমন হয়, সামনে ঠিক তেমনই কিছু হবে। কিন্তু একটু একটু করে ভেতরে যেতে শুরু করতেই আমার ধারণা একেবারে পাল্টে গেল। যতই ভেতরে যাই, গুহার মুখ ততই ছোট হতে থাকে আর আলো কমতে থাকে। একপর্যায়ে দেখি ভেতরে রীতিমতো অন্ধকার, মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়েও তেমন কিছু বোঝা যাচ্ছে না। পায়ের নিচ দিয়ে বয়ে চলা পানির ধারা এই অভিজ্ঞতায় নতুন মাত্রা যোগ করছিল, মনে কেমন একটা গা-ছমছমে শিহরণ বয়ে যাচ্ছিল। আরও কিছুটা পথ যেতেই আশার আলো দেখতে পেলাম। সেই আলো দেখে কী যে খুশি লাগছিল, বলে বোঝানো যাবে না। দ্রুত গুহা থেকে বেরিয়ে এলাম, তখন একেবারে অন্য রকম একটা অনুভূতি কাজ করছিল। পেছনে থাকা সবাই একে একে বেরোল। তবে সবার শেষে মিহির স্যারকে গুহার মুখ থেকে বেরোতে দেখে অবাক হলাম। তিনি প্রথমে বলেছিলেন গুহায় যাবেন না, কিন্তু নতুনকে জানার প্রতি তাঁর যে তুমুল আগ্রহ, সেটা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। জীবনে কিছু করতে চাইলে এমন মনোবল থাকা দরকার। তারপর সবাই ওপরে উঠতে শুরু করলাম। মাঝে আরও কিছু দর্শনীয় জায়গা ছিল, নির্মাণাধীন হলেও দেখতে ভালো লাগছিল। আরও কিছুটা সময় থাকতে পারলে ভালো হতো, কিন্তু আমরা সময়ের হাতে জিম্মি। সবাইকে ডেকে ডেকে বাসে তুলে এবার রওনা হলাম রাঙামাটির দিকে।

রাঙা মাটির পথে রাঙামাটি

কিছুটা পথ যেতেই পথের চেহারা একেবারে বদলে গেল। এতক্ষণ দুই ধারে পাহাড়, ঢাল আর সেগুনগাছ দেখছিলাম, এখন সেসব আর চোখে পড়ে না। এখন শুধু পানি আর পানি। চারদিক নদী আর ছড়ায় ভরা, আর সেই পানিতে সূর্যের আলোর ঝলমলানি মন ভুলিয়ে দিচ্ছিল। এমন সময় মনে পড়ে গেল রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত গান, “গ্রাম-ছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ”। সত্যিই মুগ্ধ চোখে সব যেন আনন্দ দিয়ে যাচ্ছিল। তবে কিছুটা পথ পরপরই বিজিবি ক্যাম্প এলে বাস থেমে যাচ্ছিল, এটা বেশ বিরক্ত লাগছিল। বিরক্ত লাগলেও কিছু করার ছিল না, কারণ এসব ছিল আমাদের নিরাপত্তার জন্যই।

বিকেলে আমরা রাঙামাটি শহরে পৌঁছে গেলাম। হালকা ফ্রেশ হয়ে, দুপুরের খাবার খেয়ে বাজারের দিকে গেলাম বাসার জন্য কেনাকাটা করতে। দাম তুলনামূলক সাধ্যের মধ্যে ছিল বলে অনেকেই অনেক কিছু কিনল। কেউ নিজের বা ভাইয়ের জন্য ফতুয়া, কেউ পরিবারের জন্য শাল, কেউ জামা, তো কেউ মন ভরে আচার আর চকলেট। একপর্যায়ে আমার মনে হচ্ছিল, স্যার ম্যাম বাসে ওঠার তাগাদা না দিলে সবাই মিলে দোকানের সব মালামালই কিনে ফেলত। কেনাকাটা শেষে ধীরেসুস্থে আমরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটে পৌঁছে গেলাম। এখানেই আজ রাতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা। জায়গাটা মূলত সরকারি একটা আশ্রয়স্থল, যাঁরা বিভিন্ন সংগীত বা নাচ পরিচালনা করেন, অনুশীলন করেন আর নানা অনুষ্ঠানে অংশ নেন, তাঁরা এখানে রাতে বিশ্রাম নেন। চন্দন স্যার আমাদের রুম দেখিয়ে দিলেন, আমরা যে যার মতো ফ্রেশ হয়ে কিছুটা সময় জিরিয়ে নিলাম।

রাতের খাবারের ব্যবস্থা হলো দোতলায়, তবে এই খাবার হোটেল থেকে প্যাকেটে করে আনা হলো, আমাদের হোটেল পর্যন্ত যাওয়ার খাটুনি কমল। খাবার প্রতিবারের মতো এবারও দারুণ সুস্বাদু, কিন্তু ঝালের পরিমাণও প্রতিবারের মতো তুলনামূলক বেশি। এই অতিরিক্ত ঝালের জন্য অনেক খাবার বাড়তি থেকে গেল, কিছু নষ্টও হলো। সবকিছুর সুবিধা-অসুবিধা দুই দিকই আছে। অবশ্য খাবার শেষে দই আর মিষ্টির ব্যবস্থা ছিল, সুবর্ণা ম্যাম সবাইকে এই দই-মিষ্টি খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।

খাওয়ার পর্ব শেষ হলে সবাই ওপরের রুমে এসে হাজির। আজ রাতের বিশেষ আয়োজন লটারি। রাঙামাটিতে আসার পর থেকেই তৌফিকা আপু আর নাসিহা লটারির টিকিট বিক্রি শুরু করেছিল, এবার সেই অনুষ্ঠান। লটারিতে ১৮টা পুরস্কার, আর আমরা স্যার ম্যামসহ ৪৪ জন। একে একে নম্বর বলা শুরু হলো, আর যে-ই পুরস্কার পায় সে-ই অভিনেতা জসীমের মতো আত্মহারা হয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে প্রথম পুরস্কারটা পেল হাসিবুর, আর তাতেই লটারির অনুষ্ঠান শেষ। এরপর ঘুমানোর প্রস্তুতি নেওয়ার কথা থাকলেও সবাই শুরু করল আর্জেন্টিনার খেলা দেখার প্রস্তুতি। খেলা শেষে যে যার রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। কাপ্তাই হ্রদের গল্প থাকছে পরের পর্বে।

উপন্যাস অ্যাভাটার

লিখেছেন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।