,

এক ঝলক বলধা গার্ডেন

Md. Siddiq Hasan অ্যাভাটার
পড়তে ৫ মিনিট
এই লেখায়

বেশ কিছুদিন থেকেই বলধা গার্ডেনের নাম শুনে আসছি। শহিদুল ইসলাম শামীমকে অনেকবার বলেছিও, চলো বলধা গার্ডেন যাই, কিন্তু যাওয়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। সেদিন হঠাৎ দেখলাম উদ্ভিদ চত্বর গ্রুপের পক্ষ থেকে বলধা গার্ডেনে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এর আগেরবার মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনে নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আমি যখন পোস্টটি দেখেছিলাম তখন আর কিছু করার ছিল না, তাদের ফাইনাল লিস্ট বানানো হয়ে গিয়েছিল। এবার আল্লাহ তায়ালার রহমতে সুযোগ পেয়েছি। আর দেরি না করে শামীমের সঙ্গে একমত হয়ে পোস্টে কমেন্ট করলাম, যেতে চাই। দেখলাম সিলেক্টেড লিস্টে আমাদের নামও চলে এসেছে। যাওয়ার সুযোগ পেয়ে খুব খুশি হলাম। চেয়েছিলাম আরও কিছু বন্ধুকে সঙ্গে নিতে, কিন্তু পারিনি, কারণ উদ্ভিদ চত্বরের প্রত্যাশিত লোকজন হয়ে যাওয়ায় তারা আগেই পোস্টটি ক্লোজ করে দেয়। দুঃখ হলেও আমি সীমাবদ্ধ, আমার হাতে কিছু ছিল না। যাই হোক, এখন শুধু সেই দিনের অপেক্ষা।

গেটের সামনে

অবশেষে গত শুক্রবার এসেই গেল, রওনা দিলাম বলধা গার্ডেনের উদ্দেশ্যে। সময় বলা হয়েছিল সকাল ৯টা, আমরা গেছি সাড়ে ৮টায়। গেটের সামনে যেতেই বুদ্ধ নারিকেলের (Pterygota alata) ঘ্রাণ পেয়ে শিবলির দেয়াল পেরিয়ে আকাশপানে তাকালাম। সত্যিই বিশাল এক বুদ্ধ নারিকেল গাছ দাঁড়িয়ে আছে, আর তার ফুলের ঘ্রাণে চারদিক মোহিত। আসলে বলধা গার্ডেনের দুটি অংশ: একটির নাম শিবলি, যা সবার জন্য উন্মুক্ত, টিকিট কেটে যে কেউ যেতে পারে। আর ছোট অংশটির নাম সাইকি, যা সংরক্ষিত। যাওয়ার আগেই আসমা অন্বেষা ম্যামের একটা পোস্টে খুব সুন্দর করে সবকিছু ব্যাখ্যা করা ছিল, যা খুব কাজে এসেছিল। শিবলির মূল গেটের দিকে তাকিয়েই দেখি রাজ অশোক (Amherstia nobilis), যার দেখা পাওয়ার জন্য অনেক দিন ধরে ব্যাকুল ছিলাম। সাইকির দেয়ালের ওপরে চোখ পড়ল এক বিশাল গাছে, যার ফলগুলো দেখতে বড় পটলের মতো। গাছটা বার্মা শিমুল বা শ্বেত শিমুল (Ceiba pentandra)।

সময় কাটছিল না দেখে আমি আর শামীম বাইরে থেকেই সাইকির এক চক্কর দিয়ে এলাম। বাইরে থেকে অনেক কিছুই দেখা যায় না, তবে একটা গাছ চোখে পড়েছিল। প্রথমে তাকে অশোক বলেছিলাম, কিন্তু নিশ্চিত ছিলাম এটা অশোকের কোনো জাত হলেও ঠিক অশোক না। পরে সাইকির ভেতরে গিয়ে জানলাম তার নাম স্বর্ণ অশোক (Saraca thaipingensis)। পুরো বাইরেটা ঘুরে বুঝলাম, সাইকি আসলে খুব একটা বড় জায়গা না। তারপর আবার গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম। তখনো ৯টা বাজেনি।

এবার খেলাম এক ধাক্কা। দাঁড়িয়ে আছি তো আছিই, কেউ নেই, কোনো পরিচিত মুখ নেই। যে-ই আসছে ভাবছি ইনি হয়তো উদ্ভিদ চত্বরের, কিন্তু না…

৯টার আশপাশে কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ গেটের সামনে দাঁড়ালেন, ভাবলাম এঁরা হয়তো আমাদের সঙ্গে। কিন্তু তাঁরাও গেটের ভেতরে চলে গেলেন। খুব বিপদ! কারও সঙ্গে যোগাযোগ করব, এমন নম্বরও নেই। শামীম বলছে, গত দিন নম্বরটা নিয়ে রাখা উচিত ছিল, ভুল হয়ে গেছে। অনেক জল্পনা-কল্পনা, কী করি! উদ্ভিদ চত্বর গ্রুপে ঢুকে বেশ কয়েকবার ইভেন্ট ম্যানেজার আসমা অন্বেষা ম্যাম, জায়েদ ফরিদ স্যার আর অলকা হালদার ম্যামের ছবি দেখে নিলাম, যেন চিনতে পারি। কিন্তু না, কিছুই হচ্ছে না। এক ভাইকে দেখলাম বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন, দেখতে কিছুটা জায়েদ স্যারের মতো। শামীমকে সাহস করে জিজ্ঞেস করতে বললাম তিনি আমাদের সঙ্গে কি না। শামীম কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ভাই, আপনি কি উদ্ভিদ চত্বর থেকে? তিনি বললেন, উদ্ভিদ চত্বর? এটা কী? আমি তো আমার এক বন্ধুর জন্য দাঁড়িয়ে আছি। আরও সমস্যা, এবার কী করব?

মনে প্রশ্ন ভেসে আসতে লাগল, অবশেষে কি বলধা গার্ডেনের এত কাছে এসেও ফিরে যেতে হবে? শামীমকে বলতেই আছি, ভাই কিছু করো। প্রতিবারই তার একটাই উত্তর, আমি কী করব! কিছুক্ষণ পর আরেক ভাই গেটের ভেতর থেকে বেরোলেন। আবার শামীমকে জিজ্ঞেস করার জন্য ফুসলাতে শুরু করলাম। সে এবার আমার ওপর বিরক্ত: তুমি কী শুরু করেছ এসব, নিজে গিয়ে জিজ্ঞেস করো। তবু শেষে শামীমই গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ভাই, আপনি কি উদ্ভিদ চত্বর থেকে এসেছেন? তাঁর ইতিবাচক উত্তর শুনে স্বস্তি পেলাম। আলহামদুলিল্লাহ, পেয়েছি একজনকে! এবার তাহলে বলধা গার্ডেনে যাওয়া হচ্ছে। রিয়াজ রনি ভাইয়ের সঙ্গেই প্রথম কথা হলো আমাদের।

সাইকির ভেতরে

সাইকির গেট খুলে দেওয়া হলো আমাদের জন্য। অসাধারণ এক জায়গা। ঢুকতেই বেহেশতের বুলবুল বা পিস লিলির (Spathiphyllum wallisii) দেখা পেলাম। তারপর ধীরে ধীরে চারদিকে যত দেখি, শুধু মুগ্ধ হয়ে যাই। শাপলার সমাহার আমার সত্যিই খুব ভালো লেগেছে। একসঙ্গে সাদা শাপলা (Nymphaea pubescens), নীল শাপলা (Nymphaea nouchali), কেপ-ব্লু শাপলা (Nymphaea capensis), লাল শাপলা (Nymphaea rubra)। আহা, মন জুড়িয়ে যায়।

সামনে যেতে থাকি, আর নতুন নতুন উদ্ভিদের দেখা পেয়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। একটা খাঁচার মধ্যে কিছু অর্কিডের সম্ভার ছিল। নাম-না-জানা একটাকে ক্যামেরাবন্দি করতে পেরেছিলাম।

সাইকিতে খুব আশ্চর্য হয়েছিলাম, কারণ অধিকাংশ উদ্ভিদই নতুন, আর যেগুলো পরিচিত, সেগুলোরও নানা জাতের সমাহার রাখা ছিল। বাসকের (Adhatoda vasica) এত বড় গাছ হয়, আগে জানা ছিল না। সাইকাসের কালেকশনটাও দারুণ। নতুন নতুন গাছের নাম লিখেই যাই, লিখেই যাই, শেষ হয় না। পুরো এলাকা ঘুরে এবার সবাই গেলাম শিবলির দিকে।

শিবলিতে

শিবলির গেটে ঢুকে একটু শান্তি পাওয়া গেল, কারণ কিছু হলেও পরিচিত গাছপালার দেখা মিলছিল। বাস্কেট বাদামের (Sterculia foetida) বেশ কিছু গাছ শিবলি আর সাইকি দুই অংশেই দেখেছি। পাদুকের (Pterocarpus indicus) দেখাও যে এখানে পাব, আশা করিনি। শিবলির শেষ প্রান্তে গিয়ে ক্যামেলিয়া (Camellia japonica) আর রুদ্র পলাশ বা আফ্রিকান টিউলিপের (Spathodea campanulata) একসঙ্গে দেখা পেলাম।

ফেরার পথে কবিদের কবিতা লেখার সেই ঐতিহাসিক ঘরটার পাশ দিয়ে হেঁটে আসছিলাম। হঠাৎ দেখি সেটা আমাদের জন্য খুলে দেওয়া হলো। দেখে আমি তো অবাক! একা এলে কখনোই এটা সম্ভব হতো না। আমরা সবাই উঠলাম সেখানে, ছবি তোলা হলো, অনেক কথাবার্তা হলো।

বিদায়, তবে শেষ বিদায় নয়

এবার যাওয়ার সময় হয়ে আসছিল, বিদায় নেওয়ার পালা। সবাই গেটের সামনে জড়ো হলাম। বিদায় জানাতে যাব, ঠিক সেই সময় কেউ বললেন, দুপুরের খাবারের হালকা ব্যবস্থা আছে, সবাই ফখরুদ্দিনে চলেন। গেলাম সেখানে, ভালো খাওয়াদাওয়া হলো। এবার সত্যি সত্যিই বিদায়ের পালা। জানি না কেন মনে হচ্ছিল, সকাল থেকে যতবার ধাক্কা খেয়েছি, আবারও যদি এক ধাক্কা খাই, ধাক্কা খেয়ে আরও কিছুক্ষণ তাঁদের সঙ্গে থেকে যাই। অচেনা সবাইকে সেই সময় খুব পরিচিত মনে হচ্ছিল। সবাইকে বিদায় জানিয়ে চলে এলেও মনে মনে ধরে রেখেছি, এটাই শেষ বিদায় নয়। আবার দেখা হবে পরের অভিযানে, ইনশাআল্লাহ।

সেদিন যে গাছগুলো দেখলাম

  • বুদ্ধ নারিকেল (Pterygota alata)
  • শ্বেত শিমুল বা বার্মা শিমুল (Ceiba pentandra)
  • বেহেশতের বুলবুল / পিস লিলি (Spathiphyllum wallisii)
  • সাদা শাপলা (Nymphaea pubescens)
  • নীল শাপলা (Nymphaea nouchali)
  • কেপ-ব্লু শাপলা (Nymphaea capensis)
  • লাল শাপলা (Nymphaea rubra)
  • রাজ অশোক (Amherstia nobilis)
  • স্বর্ণ অশোক (Saraca thaipingensis)
  • বাসক (Adhatoda vasica)
  • বাস্কেট বাদাম (Sterculia foetida)
  • পাদুক (Pterocarpus indicus)
  • ক্যামেলিয়া (Camellia japonica)
  • রুদ্র পলাশ / আফ্রিকান টিউলিপ (Spathodea campanulata)
Md. Siddiq Hasan অ্যাভাটার

লিখেছেন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।