শামীমের সঙ্গে বসে আছি। হঠাৎ সে তার ক্যামেরা বের করতেই মনে পড়ল, উদাল (Sterculia villosa) গাছে এখন ফুল ধরে আছে। সঙ্গে সঙ্গে গত বছরের কথাও মনে পড়ে গেল। থোকায় থোকায় হলুদ ফুল ধরা দেখে আমি তখন অনেকটাই নিশ্চিত ছিলাম, এটা আমড়া গাছ। পরে ফুলের গঠন দেখে নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছিলাম।
উদাল আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশেরই গাছ। বাংলাদেশ তো বটেই, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কিছু দেশেও এর দেখা মেলে। গাছটা নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া দরকার বলে আমার মনে হয়। এখন পর্যন্ত যেসব গবেষণা হয়েছে, তাতে উদালের নির্যাসে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল আর অ্যান্টিফাংগাল গুণের কথা বলা হয়েছে। কোষের মেমব্রেন স্থিতিশীল রাখা আর রক্ত জমাট বাঁধায় বাধা দেওয়ার মতো ফলাফলও গবেষণাগারে পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে। রাসায়নিক বিশ্লেষণে এতে ফ্ল্যাভোনয়েড, ট্যানিন আর অ্যালকালয়েডের মতো যৌগ পাওয়া গেছে, আর গ্রামে পোড়া জায়গায় এর রস লাগানোর চলও আছে।
ক্যামেরা হাতে উদালের কাছে
গতবার পারিনি, কিন্তু এবার এই উদালকে ক্যামেরাবন্দি করা দরকার। শামীমকে বললাম, ভাই চলো, আমাকে উদালের কিছু ছবি তুলে দাও। সে বাইরে থেকেই কয়েকটা ছবি তোলার চেষ্টা করল। কিন্তু খুব একটা ভালো ছবি না আসায় বললাম, চলো ভিতরে যাই।
অনেক দিন ধরেই ঢাকা ইউনিভার্সিটির বোটানিক্যাল গার্ডেনে গ্রিনহাউস প্রজেক্টের কাজ চলছে, তাই আগের মতো আর ভিতরে যাওয়া হয় না। এখন ভিতরে গেলে কেমন যেন এলোমেলো লাগে। আগে গার্ডেনে ঢুকলেই একটা শান্তি অনুভব করতাম, সেটা এখন আর পাওয়া যায় না। যা-ই হোক, গেলাম উদালের কাছে। কিছু ছবি তুলে গাছটার নিচে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। ভালোই লাগছিল। কিন্তু বাসের সময় হয়ে যাচ্ছিল, তাই বেরিয়ে পড়তে হলো।
ঝিনুক কুড়োতে গিয়ে মুক্তা
নীল টিনে ঘেরা সেই গ্রিনহাউস প্রজেক্টের এলাকা থেকে আমরা বের হচ্ছি, হঠাৎ আমার চোখ পড়ল একটা গাছে। আমি তো খুশিতে ডগমগ। ডাক দিলাম, শামীম, এদিকে এসো। ফোন বের করে কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। পাথরকুচির (Bryophyllum pinnatum) ফুল এর আগে দেখেছিলাম নানির বাড়িতে। রান্নাঘরের চালের উপর কয়েকটা পাথরকুচি রাখা থাকত, আর মই বেয়ে ছাদে উঠতে গেলেই তাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যেত। আজ এই জায়গায় এভাবে ফুলসুদ্ধ পাথরকুচির দেখা পাব, আশা করিনি। অবস্থাটা অনেকটা ঝিনুক কুড়োতে গিয়ে মুক্তা পাওয়ার মতো।
পাতার কিনারায় নতুন প্রাণ
পাথরকুচি আমাদের খুব পরিচিত গাছগুলোর একটি। এর পাতার কিনারা থেকে এমনি এমনিই চারা গজানোর ঘটনা সবাই জানে। এটা ঘটে কারণ পাতার বাইরের প্রান্তের দিকে, মানে পেরিফেরাল রিজিওনে, অনেক মেরিস্টেমেটিক টিস্যু থাকে। সাধারণত একটা নির্দিষ্ট টিস্যু থেকে নির্দিষ্ট টিস্যুই তৈরি হয়, যেমন মূলের টিস্যু থেকে মূল, কাণ্ডের টিস্যু থেকে কাণ্ড। কিন্তু মেরিস্টেমেটিক টিস্যু এক ধরনের বিশেষ ভাজক টিস্যু, যার থেকে কী তৈরি হবে, পাতা না মূল, কাণ্ড না ফুল, তা আগে থেকে ঠিক করা থাকে না। গাছের যখন যেটা দরকার, এই টিস্যু সেটাই বানাতে পারে।
তাই একটা পাথরকুচির পাতা যদি কিছুদিন পর্যাপ্ত পানি পায়, তার কিনারায় অসংখ্য নতুন চারার দেখা পাওয়া সম্ভব। এ কারণেই একে লাইফ প্ল্যান্ট বা জীবন উদ্ভিদও বলা হয়। শুধু পাতা থেকে চারা জন্মায় বলেই নয়, এর ভেষজ গুণের জন্যও নামটার চল আছে।
ঘরের পাশের ভেষজ
পাথরকুচির ভেষজ ব্যবহার বেশ বিস্তৃত। গ্রামে ক্ষত আর পোড়া জায়গায় এর পাতা, মূল আর কাণ্ড ব্যবহারের চল আছে বহুদিনের। ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়াজনিত চর্মরোগে এর পাতা, কাশিতে রসালো পাতার রস, আর কিডনির পাথরের সমস্যায়ও গ্রামে পাথরকুচি ব্যবহার করা হয়। লিভারের আরাম আর উচ্চ রক্তচাপ কমানোর কথাও লোকমুখে শোনা যায়।
পাথরকুচির পাতায় বুফাডিয়েনোলাইড নামে এক ধরনের স্টেরয়েড যৌগ পাওয়া যায়। গবেষণায় এর অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণের কথা বলা হয়েছে, তবে এই যৌগগুলো হৃৎপিণ্ডের উপরও প্রভাব ফেলে, গবাদিপশুর জন্য গাছটা যে বিষাক্ত তার কারণও এটাই। তাই পাথরকুচি খাওয়ার ব্যাপারে একটু সাবধান থাকা ভালো। এ ছাড়া স্টিয়ারিক, পামিটিক আর লিনোলেয়িক অ্যাসিডের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাটি অ্যাসিডের উৎসও এই গাছ।
আমরা বাড়ির আশেপাশে এই পাথরকুচি গাছ লাগিয়ে রাখি ঠিকই, কিন্তু এর যে এত গুণ, তা আর কয়জন জানি।
এখানে লেখা ভেষজ ব্যবহারগুলো শুধু জানার জন্য। কোনো রোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

মন্তব্য করুন