ভালোবাসার রক্তচন্দন

উপন্যাস অ্যাভাটার
পড়তে ৬ মিনিট
এই লেখায়

একদিন বেড়াতে গিয়েছিলাম এক আত্মীয়ের বাসায়। সেখানে দেখি কয়েকটা ছেলেমেয়ে জেমস চকলেট নিয়ে খেলা করছে। আমারও ছোটবেলা এই জেমস চকলেট খেয়েই কেটেছে। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, কমলা, প্রায় রংধনুর সব রঙেই ভরা থাকত চকলেটগুলো। গ্রামের ছেলেমেয়েরাও চকলেট দিয়ে খেলা করে দেখে মজা পেয়েছিলাম, আবার খাবার নিয়ে খেলা করায় একটু বিরক্তও হয়েছিলাম।

কিন্তু একটা ব্যাপারে খটকা লাগল। সবগুলোই লাল, অন্য কোনো রং নেই। কৌতূহল হওয়ায় কাছে গিয়ে দেখি, ওগুলো ঠিক জেমস চকলেট না, তবে কিছু একটা। জিজ্ঞেস করলাম, এগুলো কোথায় পেয়েছ? ওদের উত্তর, একটা গাছের নিচে পড়ে থাকে। একটা চাইলাম, কিছুতেই দিল না। অপরিচিত কেউ কারও প্রিয় খেলার জিনিস চাইলে কেনই বা দেবে? ঠিক আছে, দিতে হবে না, গাছটা কোথায় সেটা অন্তত বলো। তাতেও কোনো লাভ হয়নি।

তখন তো আর গাছপালা নিয়ে এত ভাবতাম না, তাই ব্যাপারটা অতটা টানেনি, বাসায় চলে এসেছিলাম। তবে একটা কথা সেদিন বুঝেছিলাম। এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে যদি কারও নাম বলতে হয়, সেটা গাছপালা। ওদের অনুকরণ করেই আমাদের ভাবনাচিন্তা।

গার্ডেনের শেষ প্রান্তে আবার দেখা

অনেক দিন পর ভার্সিটিতে এসে আমাদের গার্ডেনের শেষ প্রান্তে হাঁটাহাঁটি করার সময় সেই পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল, কারণ আবার দেখা পেয়েছিলাম সেই লাল জিনিসগুলোর। হাতে নিয়ে বুঝলাম, এগুলো আসলে বীজ। খুব সুন্দর গোলগাল, টকটকে লাল। বেশ কিছু কুড়িয়ে নিলাম আর আশেপাশে গাছ খুঁজতে লাগলাম, কার বীজ এগুলো। একটা গাছ চোখে পড়ল, লম্বা, কিন্তু প্রচুর ডালপালাওয়ালা। গাছটাকে চিনতাম না। তবে গার্ডেনে পেয়েছি মানে পরিচয় পাবই, এটা নিশ্চিত ছিলাম।

সত্যিই পরিচয় পেয়ে গেলাম। গাছটা রক্তচন্দন, বৈজ্ঞানিক নাম Adenanthera pavonina, Fabaceae পরিবারের সদস্য। আসলে নামটা পেয়ে গেলেই সব জানা যায়, শুধু নামটাই দরকার। চীন, মালয়েশিয়া আর দক্ষিণ ভারতে এর উৎপত্তি হলেও আরও অনেক দেশেই রক্তচন্দনের দেখা মেলে। এর ইংরেজি নাম অনেকগুলো, তবে একটা নাম কখনও ভুলব না, মিউচুয়াল লাভ বিন। আমাদের পাশের দেশ চীনে এই গাঢ় লাল বীজগুলো ভালোবাসার প্রতীক। আমাদের দেশে যেমন লাল গোলাপ, সেদেশে তেমনি রক্তচন্দনের বীজ।

রাস্তার মাঝখানে বসে বীজ কুড়ানো

ও, গত মাসের একটা ঘটনা মনে পড়ল। আমি আর আমার ভাই জামান ভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরছিলাম হেঁটে। হঠাৎ রাস্তায় কিছু রক্তচন্দনের বীজ পড়ে থাকতে দেখলাম। আগে যে বীজগুলো কুড়িয়েছিলাম সেগুলো হারিয়ে ফেলেছি, তাই সেখানেই বসে পড়ে কুড়োতে লেগে গেলাম। বেশি কুড়োতে পারিনি, কারণ মানুষজনের চলাচলে অসুবিধা হচ্ছিল। এভাবে হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে বসে পড়ায় জামান তো রেগেই গেল। পারলে আমাকে সেখানে রেখেই চলে যায়, এমন অবস্থা।

তবে মানুষের গতানুগতিক স্বভাব দেখে মজা পেয়েছিলাম। আমাকে কুড়োতে দেখে কেউ কেউ নিজেও দু-একটা কুড়িয়ে নিল, তারপর জিজ্ঞেস করল, এগুলো কী, কী কাজে লাগে। অনেককেই সেদিন বীজগুলোর পরিচয় দিয়েছিলাম। পরিচয় জেনে কেউ সঙ্গে নিয়ে গেল, আর কেউ হয়তো কিছু না বুঝে আমার হাতে দিয়ে চলে গেল। হঠাৎ মনে হলো, এখানে এই বীজ এল কোথা থেকে, আগে তো এদিকে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। পাশেই দেখি একটা দোকানের উপরে বিশাল এক রক্তচন্দন গাছ কেটে রাখা আছে। কাঠের টকটকে লাল রং দেখে এর আরেকটা ইংরেজি নাম মনে পড়ে গেল, রেড বিড ট্রি। যদিও নামটা এসেছে কাঠ থেকে নয়, পুঁতির মতো এই লাল বীজগুলো থেকে। একটা ডাল ভেঙে দেখলাম, বেশ শক্ত।

জামান এবার রেগে বলেই বসল, তোমার হয়েছে, না আমি একাই চলে যাব? ওর সঙ্গে বাসার দিকে হাঁটতে লাগলাম, কিন্তু চোখ শুধু হাতের বীজগুলোর দিকেই যাচ্ছিল। সবগুলো একই রকম গোল, ওজনেও মনে হয় একই রকম। হয়তো সে কারণেই আগে ভারতবর্ষে এগুলো দিয়ে সোনা মাপার মতো সূক্ষ্ম মাপজোখ করা হতো। সোনা মাপার কথায় কুঁচের (Abrus precatorius) কথাও মনে পড়ল, ওর বীজগুলোও একই রকম ওজনের হয় বলে একই কাজে ব্যবহার করা হতো। ভেবেছিলাম পরের দিন আরও কিছু বীজ কুড়িয়ে নেব, কিন্তু পরের দিন আর দেখা পাইনি, দোকানের উপর থেকে গাছটা নিয়ে চলে গেছে। মনটা একটু খারাপ হয়েছিল, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, এখানে যখন বীজ ধরেছে, তখন আমাদের গার্ডেনের গাছেও বীজ পাওয়া যাবে। দুঃখ আর থাকল না।

সবার কাছ থেকে ভালোবাসা নেওয়া

ক্লাসের ফাঁকে সময় পেয়েই আমি, শামীম আর রাসিফ আরও কিছু বীজ কুড়ানোর জন্য গেলাম গাছটার নিচে। সঙ্গে মনে হয় জাফিরুলও ছিল। গিয়ে দেখি কিছু ডালপালা পড়ে আছে। বাইপিনেট পাতা, আর তার সঙ্গে অনেকগুলো বড় শিমের মতো প্যাঁচানো ফল। এর মধ্যেই আটকে আছে লাল লাল বীজগুলো। ভালোই হলো, মাটি থেকে না কুড়িয়ে ফলগুলো থেকেই বীজ ঝরিয়ে পেয়ে গেলাম অনেকগুলো ভালোবাসা। সবার কাছ থেকে বীজগুলো নিয়ে ব্যাগে রাখা কৌটায় ভরলাম। মনে একটাই কথা ঘুরছিল, সবার কাছ থেকে ভালোবাসা নিয়ে নিলাম। যদিও পরে সবাইকে বলছিলাম, ভালোবাসা নাও, আর একটা একটা করে বীজ দিচ্ছিলাম।

দেশে দেশে রক্তচন্দন

বিভিন্ন দেশে রক্তচন্দনের বিভিন্ন কাজ। ফিলিপাইনে আগে কাপড় কাচা আর চুল পরিষ্কার করার জন্য এর বাকল ব্যবহার করা হতো। পাপুয়া নিউগিনিতে এর কচি পাতা শাক হিসেবে খুব প্রচলিত। বীজ ছোট আর অপরিপক্ব অবস্থায় বিষাক্ত হলেও পুরোপুরি পাকা বীজ রান্না করে খাওয়া যায়। ব্রাজিলে এই গাছ লাগানো হয় বন ফিরিয়ে আনার জন্য। এর কাঠ খুব শক্ত, আর লালচে রং কাঠটাকে একটা আলাদা সৌন্দর্য দিয়েছে। তাই আসবাবপত্রের পাশাপাশি নৌকা বানানোর কাজেও এই কাঠ ব্যবহার করা হয়। বাকলে স্যাপোনিন থাকায় মাঝে মাঝে নাকি সাবান বানানোর কাজেও এর ব্যবহার আছে।

এবার গাছের একটু গভীরে যাওয়া যাক। রক্তচন্দনের ক্রোমোজোম সংখ্যা আমাদের চেয়ে আলাদা। মানুষের দেহকোষে ক্রোমোজোম থাকে ৪৬টি, আর এই গাছের ২৬টি। রাসায়নিক বিশ্লেষণে এতে রবিনেটিন, বিউটেইন আর ডাইহাইড্রোরবিনেটিনের মতো বেশ কিছু ফ্ল্যাভোনয়েড পাওয়া গেছে, আর কাঠে পাওয়া গেছে ডাইহাইড্রক্সিবেনজোয়িক অ্যাসিড। বাকলে আছে স্যাপোনিন, স্টিগমাস্টেরল, ওলিয়ানোলিক অ্যাসিড আর বেশ কয়েকটি অ্যামাইনো অ্যাসিড। বীজে পামিটিক অ্যাসিডসহ কয়েকটি ফ্যাটি অ্যাসিড, স্টিগমাস্টেরল আর গ্যালাক্টোম্যানান পাওয়া যায়, আর পাতায় অ্যালকালয়েড। এসব যৌগের নাম পড়াও কষ্ট, লেখাও কষ্ট। কিন্তু বাস্তবে এগুলোর ব্যবহার যখন জীবনের কষ্ট কমিয়ে দেয়, তখন আর জানতে কষ্ট মনে হয় না।

ভেষজ হিসেবে রক্তচন্দন

লোকজ চিকিৎসায় রক্তচন্দনের ব্যবহার অনেক পুরোনো। পোড়া জায়গায় এর বীজ ব্যবহারের চল আছে, আর ফুসফুস আর চোখের সমস্যাতেও বীজ ব্যবহারের কথা বলা হয়। বাতের ব্যথা আর প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়ার মতো সমস্যায় পাতা আর বীজ একসঙ্গে ব্যবহার করা হতো, আর ডায়রিয়া ও আমাশয়ে কচি পাতা। এর শিকড় গ্রামে বমি করানোর ওষুধ হিসেবে পরিচিত।

পেটের ভিতরে লুকিয়ে থাকা একটা জীবাণুর কথাও বলি। Campylobacter jejuni নামের এক ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে রক্তচন্দনের নির্যাস কাজ করেছে বলে একটি গবেষণায় জানানো হয়েছে, মানে এর অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণের একটা প্রমাণ মিলেছে। যদিও এটা এখনও ইঁদুরের উপর পরীক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তবু কাজ তো করেছে। একদিন না একদিন হয়তো আমাদেরও উপকারে আসবে।

যা-ই হোক, বীজ যেহেতু বাসাতেই আছে, যেকোনো সময় রক্তচন্দনের চারা বানিয়ে লাগিয়ে দেব কোনো এক বাগানের কোণায়। কিছু বছর পর আর বাইরে কোথাও গিয়ে কুড়োনোর দরকার হবে না। বছরে দুবার ফুল ধরবে, আর দুবার করে আমার নিজের রক্তচন্দন গাছ থেকে অনেক অনেক ভালোবাসা পাব।

এখানে লেখা ভেষজ ব্যবহারগুলো শুধু জানার জন্য। কোনো রোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

উপন্যাস অ্যাভাটার

লিখেছেন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।