ভূঁই আমলার নাম শুনেছেন?

উপন্যাস অ্যাভাটার
পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায়

কোনটা ভূঁই আমলা, এই প্রশ্নটা বেশ কিছুদিন আমাকে একরকম বিরক্ত করেছে বললেই চলে। বইতে প্রথম এর ছবি দেখি। পরে একদিন শহীদুল দেখিয়ে দিল, এটা ভূঁই আমলা। দেখে ভেবেছিলাম পরেরবার দেখলেই চিনে ফেলব, তাই শুধু দূর থেকে দেখেই চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু না, এটা আমার ভুল ধারণা ছিল। দেখতাম, কিন্তু বুঝে উঠতে পারতাম না কোনটা ভূঁই আমলা। তেঁতুল, আমলকী, পানিসিটকি আরও অনেক কিছুর সঙ্গেই গোলমাল পাকিয়ে ফেলতাম।

ছোট গাছ রাসিফ ভালো চেনে বলে তাকে একদিন বললাম, আরেকবার দেখিয়ে দাও তো। এবার কাছে থেকে নেড়েচেড়ে দেখলাম উদ্ভিদটাকে। ছোট আকারের গাছ, প্রথমে ভেবেছিলাম ভূঁই আমলার চারা হয়তো। পরে জানলাম, সে এর চেয়ে বড় হয় না, মাত্র ৫০ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার উচ্চতার উদ্ভিদ।

পাতার নিচে লুকোনো ফুল

সেদিন আরও একটা বৈশিষ্ট্য খেয়াল করেছিলাম, যেটার মাধ্যমে আজও ভূঁই আমলাকে সহজেই চিনতে পারি। এর পাতাগুলোর নিচ দিয়ে খুব সুন্দরভাবে ফুল ধরে থাকে। দুই পাশে পাতা আর মাঝ দিয়ে ফুল। এই জন্যই এর গণের নাম Phyllanthus, যার মানে পাতা ও ফুল। যাদের ফুল ও ফল পাতার সঙ্গে এভাবে যুক্ত থাকে, তাদের এই গণের মধ্যে রাখা হয়।

ভূঁই আমলার বৈজ্ঞানিক নাম Phyllanthus niruri। আগে একে Euphorbiaceae পরিবারে রাখা হতো, এখন Phyllanthus গণটাকে আলাদা করে Phyllanthaceae পরিবারে রাখা হয়েছে। আরেকটা কথা বলে রাখি, আমাদের এই অঞ্চলে ভূঁই আমলা নামে মাঠেঘাটে যে আগাছাটা দেখা যায়, সেটা অনেক সময় Phyllanthus amarus, যাকে দীর্ঘদিন P. niruri-র সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। এই গণের আরেকটি পরিচিত গাছ হলো আমলকী, Phyllanthus emblica।

চাচার বাড়ির আমলকী গাছ

আমাদের বাসার পাশে চাচার বাড়িতে একটা বিশাল বড় আমলকী গাছ ছিল। ছোট থাকতে স্কুল ছুটি হলেই বাসায় ফেরার পথে কত ঢিল ছুড়ে থোকায় থোকায় ধরে থাকা ফলগুলো পেড়েছি। আমলকী খেতাম আর পানি খেতাম, পানি খুব মিষ্টি লাগত। কিন্তু আমাদের ঢিল ছোড়ায় অতিষ্ঠ হয়েই হয়তো একদিন গাছটা কেটে ফেলা হয়েছিল।

ছেলে ফুল না মেয়ে ফুল

যাই হোক, আমরা ভূঁই আমলার কথা বলছিলাম। এই বর্ষজীবী উদ্ভিদটির সারা বছর দেখা পাওয়া গেলেও বর্ষায় বেশি পাওয়া যায়। স্যাঁতসেঁতে জায়গা এর খুব পছন্দ, পেলেই ঝাঁকে ঝাঁকে বীজ থেকে নিজেদের বংশবিস্তার করে ফেলে। ফুলগুলো হলুদাভ সাদা রঙের হয়। নিজে কোনোদিন দেখিনি, তবে শুনেছি লাল রঙের ফুলও নাকি হয়। ফল হয় একেবারে ছোট্ট।

এখন দূর থেকে দেখলেই উদ্ভিদটা অনায়াসে চেনা গেলেও নতুন এক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এই ছোট্ট গাছটায় ছেলে ফুল আর মেয়ে ফুল আলাদা, একই গাছে দুই রকম ফুল ধরে। আমি তো ভূঁই আমলার ফুল দেখলে বুঝতেই পারি না কোনটা ছেলে আর কোনটা মেয়ে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য আবারও কারও সাহায্য লাগবে।

যৌগের খনি

ভালোভাবে জানার জন্য বিভিন্ন বই আর জার্নাল ঘেঁটে আমি একটু অবাকই হয়েছি। যতই পড়ি, ততই নতুন নতুন তথ্য পাই। এত ছোট একটা উদ্ভিদে এত যৌগ, যৌগের খনি বললেও কম বলা হয়। ফ্ল্যাভোনয়েড, অ্যালকালয়েড, ট্যানিন, লিগন্যান, তার মধ্যে phyllanthin আর hypophyllanthin সবচেয়ে বেশি আলোচিত, আর আছে quercetin, gallic acid, beta-sitosterol-এর মতো যৌগ। কাণ্ড, পাতা, মূল, প্রতিটা অংশেরই আলাদা আলাদা তালিকা। ভাবছিলাম মূলে যৌগের নাম কম পাব, কিন্তু মূলেও কম না। বেশি উপকারী তো, তাই গবেষণাও হয়েছে বেশি।

ভেষজ হিসেবে ভূঁই আমলা

এবার কাজের কথায় আসি। আমরা তো আর এমনি এমনি কোনো উদ্ভিদে কী কী যৌগ আছে তা বের করি না, উদ্দেশ্য থাকে কোন যৌগ কী কাজে লাগে সেটা দেখা। ভারত, ক্যারিবিয়ান, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, পেরু, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বহু দেশে ভূঁই আমলা বহু আগে থেকে ভেষজ উদ্ভিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। চীনের ট্রেডিশনাল মেডিসিন, ইন্দোনেশিয়ার জামু, এমনকি ভারতের আয়ুর্বেদ শাস্ত্রেও এর ব্যবহার লিপিবদ্ধ আছে।

যতদূর জানা যায়, লিভারের সমস্যায় শিকড়ের ব্যবহার থেকেই প্রথমে এর পরিচিতি। গ্রামীণ ওষুধ হিসেবে কিডনির পাথর, জ্বর, কাশি, অনিদ্রা, ক্ষুধামান্দ্য আর চর্মরোগে এর ব্যবহারের কথা শোনা যায়। পাতা বা বীজ বেটে চুলকানি, দাদের মতো চর্মরোগে প্রলেপ দেওয়ার চল আছে। কিডনি আর পিত্তথলিতে পাথর জমার সমস্যায় এই লোকজ ব্যবহার থেকেই এর আরেকটা নাম স্টোন ব্রেকার।

ল্যাবের গবেষণাতেও ভূঁই আমলা নিয়ে কম কাজ হয়নি। কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, এর নির্যাস হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের DNA polymerase আর HIV-এর reverse transcriptase এনজাইমে বাধা দেয়। তবে এগুলো পরীক্ষাগারের ফলাফল, কোনো রোগ সারার প্রমাণ নয়। যকৃতের ওপর phyllanthin আর hypophyllanthin কী প্রভাব ফেলে, গবেষকদের আগ্রহ এই দুটো যৌগের দিকেই বেশি।

এত গুণের কথা শুনে কারও যদি ফেস পাউডার, ক্রিম, দাঁতের মাজন বা মাথার তেল হিসেবে ভূঁই আমলা ব্যবহারের চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে, চিন্তাটা খুব একটা খারাপ না। প্রত্যেকটা মানুষ যদি এর সব গুণাগুণ জানত, তাহলে হয়তো আজ আর যেখানে-সেখানে একে দেখতে পাওয়া তো যেতই না, বরং খুঁজেও পাওয়া যেত না। আমাদের দেশের জন্য হয়তো বিরল, এমনকি বিলুপ্ত উদ্ভিদের খাতায় নাম চলে যেত। ভূঁই আমলার কথা বেশি কেউ জানে না বলেই আজও অভাব নেই এই বহু উপকারী আগাছাটার। আছে নিরাপদ অবস্থানে।

এখানে লেখা ভেষজ ব্যবহারগুলো শুধু জানার জন্য। কোনো রোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

উপন্যাস অ্যাভাটার

লিখেছেন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।