এই ফুলের গাছের সঙ্গে আমাদের ডিপার্টমেন্টের খুব ভালো পরিচিতি আছে। প্রথম বর্ষে যখন স্যারদের লেকচার বিরক্ত করে তুলত, তখন তাঁদের নজর ফাঁকি দিয়ে ক্লাসরুমের বাইরে চেয়ে থাকতাম। সবুজে ঘেরা স্বপ্নচত্বর দেখে একটু স্বস্তি পেতাম। কেমিস্ট্রি আর বায়োকেমিস্ট্রির মাঝের সবুজে ভরা জায়গাটার নাম যে কীভাবে স্বপ্নচত্বর হলো জানি না, তবে নামটা একদম মনের কথার সঙ্গে মিলে যায়।
সব সময় এই স্বপ্নচত্বরের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটায় গিয়ে চোখ আটকে যেত। একদম লম্বাচওড়া একটা গাছ, আর তাতে বল্লমের মতো সবুজাভ হাজারো পাতা। এই পাতাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দেয় হলুদ হলুদ ফুল। দেখতে ভালোই লাগে। ফুলগুলোর যে অনেক পাপড়ি, সেটা বুঝতেও কোনো অসুবিধা হয় না। ফিল্ড ট্রিপে কিংবা উদাহরণ দিতে স্যাররা যখনই জানালা দিয়ে বাইরের কোনো গাছ দেখান, সেটা এই স্বর্ণচাঁপাই।
যে ঘ্রাণের দ্বিতীয়টি নেই
জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই গাছ ফুল ফুটিয়ে নিজেকে অলংকৃত করে রাখে। এই সোনালি ফুলগুলোর ঘ্রাণের মতো মিষ্টি ঘ্রাণ আমি আর দ্বিতীয়টি পাইনি। এত সুন্দর ঘ্রাণ যে নিজে না পেলে বুঝানো খুব কষ্ট, বলে বুঝানো আসলেই খুব কষ্ট। এই তীব্র ঘ্রাণের জন্যই বিভিন্ন দেশে এর ফুল থেকে পারফিউম আর আতর বানানো হয়। বিখ্যাত পারফিউম জয়-এর সঙ্গে এই ফুলের নাম জড়িয়ে আছে, তাই একে মাঝেমাঝে জয় পারফিউম ট্রি বলেও ডাকা হয়। মজার বিষয় হলো, ফুলের মোহে আমরা মোহাচ্ছন্ন হলেও ভ্রমর নাকি কোনো উপায়ে এর মোহ কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। লোকে বলে, স্বর্ণচাঁপার ফুলে ভ্রমর কোনোদিন বসে না।
Michelia থেকে Magnolia
বর্তমানে স্বর্ণচাঁপার বৈজ্ঞানিক নাম Magnolia champaca হলেও স্যারদের কাছে Michelia champaca শুনে শুনে নামটা এতটাই পরিচিত হয়ে গেছে যে আলাদা করে নতুন নামটা বলতে মন চায় না। পুরোনো নামের রেশটা আমার কাছে জোরালো হলেও পরে যারা আসবে, তাদের জন্য নতুনটাই মনে রাখা সহজ হবে। Magnoliaceae পরিবারের সদস্য তো, নামের সঙ্গে পরিবারের মিল রয়েছে।
স্বর্ণচাঁপা ইন্দোমালয় অঞ্চলের গাছ। ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, ভুটান, নেপাল, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডসহ আমাদের দেশে চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে এই গাছ নিজে থেকেই জন্মে। বিভিন্ন জায়গায় চারা লাগানোও কম হয় না বলে কমবেশি সর্বত্রই দেখা পাওয়া যায়। প্রায় ৫০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। শুধু উঁচুই নয়, স্বর্ণচাঁপা উঁচু মানের কাঠের উৎসও বটে। এর বাদামি, চকলেট রঙের কাঠ দিয়ে ফার্নিচার বানানো হয়, আর কাঠের টেক্সচার প্রশংসার দাবিদার।
যে গাছ কাটা মানা
দাবিদার কথায় আগের একটা কাহিনি মনে পড়ল। চীন আর ভারতের কিছু অঞ্চলে স্বর্ণচাঁপাকে খুব পবিত্র গাছ হিসেবে ধরা হয়, অনেক জায়গায় কাটা নিষিদ্ধ বলেও জানা যায়। সেখানকার বৌদ্ধদের বিশ্বাস, অতীতের এক বুদ্ধ এই গাছের নিচে সিদ্ধি লাভ করেছিলেন, আর ভবিষ্যতে যে বুদ্ধ আসবেন তিনি সিদ্ধি পাবেন সাদা চাঁপার নিচে। এই সাদা চাঁপা, Magnolia alba, আসলে Magnolia champaca আর Magnolia montana-র সংকর। তাই ওই সব দেশের নানা জায়গায় সাদা চাঁপা লাগানো হয়।
একটু বোরিং কথাবার্তা
এবার একটু বোরিং কথাবার্তা। চাইলে কিছুক্ষণ অন্য কিছু দেখে আসতে পারেন, তারপর কিন্তু আবার এখান থেকেই পড়া শুরু করতে হবে, ফাঁকি দেওয়া চলবে না। কাণ্ডের বাকলে liriodenine, magnoflorine আর beta-sitosterol-এর মতো অ্যালকালয়েড ও যৌগ পাওয়া যায়। পাতা আর মূলেও liriodenine আছে, মূলে আরও আছে champakin আর micheliolide। আর ফুলের সুগন্ধি তেলে থাকে linalool-এর মতো যৌগ, যার জন্যই এত ঘ্রাণ।
এসব দিয়ে যা হয় তা হলো, গ্রামীণ চিকিৎসায় কাণ্ডের বাকল জ্বর, বাতের ব্যথা, ক্ষত আর আলসারে ব্যবহার করা হয়। পাতা কৃমি আর পেটব্যথায়, আর ফুল ও ফলের মিশ্রণ হজমের সমস্যায় ব্যবহারের চল আছে, বিশেষ করে যাঁদের পেটে ভূমিকম্প একটু বেশি চলে। মাথাব্যথায় ফুলের সঙ্গে একটু তেল মিশিয়ে কপালে মালিশ করার কথাও শোনা যায়। ফল চর্মরোগে আর শিকড় ফোড়া ও পোড়ার জ্বালায় ব্যবহার করা হয় বলে বইপত্রে লেখা আছে।
বহু গুণের অধিকারী এই পরিচিত ফুলটার একটা গাছ বাসার পাশে লাগালে উপকার আছে, এটুকু বলা চলে। মনের আদালতে বিল পাশ যেহেতু হয়েছে, লাগাব কোনো এক সময়।
এখানে লেখা ভেষজ ব্যবহারগুলো শুধু জানার জন্য। কোনো রোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

মন্তব্য করুন