আজ একটা মজার উদ্ভিদ নিয়ে কথা বলি। তার নাম ঢোল সমুদ্র। অনেক বড় বড় পাতা হয় বলে হাতির কানের সঙ্গে তুলনা করে এর আরেক নাম হস্তিকর্ণ। বৈজ্ঞানিক নাম Leea macrophylla, পরিবারের নাম ভাইটেসি (Vitaceae)।
এটা একটু স্যাঁতসেঁতে, কিন্তু পানি জমে না এমন জায়গায়, কিংবা অন্য কোনো গাছের নিচে থাকতে খুব পছন্দ করে। বর্ষার সময় হঠাৎ কোনো সাড়াশব্দ ছাড়াই কোথা থেকে চলে আসে, আর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বড় হয়ে গিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পুরো কাণ্ডই সবুজ, দেখে নরম মনে হলেও খুব একটা নরম নয়। পাতাগুলোও সবুজ, পাতার নিচের পৃষ্ঠে রোম আছে, আর পাতার মাঝখান থেকে প্রান্ত পর্যন্ত কিনারায় খাঁজ আছে।
ব্রকলির মতো ফুল
বেড়ে ওঠা দেখতে দেখতেই কাণ্ডের আগা দিয়ে গুচ্ছাকারে ফুল ফোটে। এই অবস্থায় দূর থেকে দেখলে আস্ত একটা ব্রকলির মতো মনে হয়। ফুলগুলো এত ছোট যে ভালোভাবে না দেখলে বোঝাই যায় না এর রং একটু নীলাভ সাদা। ফুল থেকে দানাদার ছোট ছোট গুলি বা মার্বেলের মতো ফল হয়, ফলগুলো পরিপুষ্ট হলে কালো রং ধারণ করে, তারপর নিজে থেকেই ঝরে যায়।
বর্ষায় আসে, শীতে হারায়
লেখার শুরুতেই মজার উদ্ভিদ বলেছিলাম, কারণ এর পুরো চক্রটা শুরুই হয় বর্ষায়, আর শীত আসতে না আসতেই শেষ হয়ে যায়। শীতকালে এর পাতা, এমনকি কাণ্ডও এমনভাবে নষ্ট হয়ে যায় যে মাটির নিচের কন্দ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তাই বছরের বাকি দিনগুলোতে এই উদ্ভিদ কোথায় ছিল, কোথায় আছে, তার কোনো খোঁজখবর অন্তত আবার বর্ষা আসার আগ পর্যন্ত পাওয়া যায় না। এজন্য একে এক বছরের গাছ ভেবে ভুল হতে পারে, কিন্তু আসলে এটা বহুবর্ষজীবী, মাটির নিচে কন্দটা বেঁচে থাকে আর প্রতি বর্ষায় সেখান থেকেই নতুন করে গজায়। আর মানুষের চোখে না পড়লেও, শোনা যায় মাটির নিচ থেকে এটি কেঁচোকে দূরে রাখে।
এই উদ্ভিদ সর্বোচ্চ প্রায় ২ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। কন্দ বা মূল আর বীজের মাধ্যমে হস্তিকর্ণের বংশবিস্তার ঘটে। এর পাতায় ফ্লাভোনয়েডসহ নানা রকম ফেনলিক যৌগ থাকে।
কিছু লোকজ ব্যবহার
হস্তিকর্ণের কিছু লোকজ ব্যবহারও আছে। গ্রামে এর মূল দাদ রোগে, আর গাছটা গাঁটে ব্যথা ও বাতে ব্যবহার করা হয়। কেটে গেলে এর পাতার রস লাগানোর চল আছে, বলা হয় এতে রক্ত পড়া কমে আর এটা অ্যান্টিসেপটিকের কাজ করে। মাঝে মাঝে আবার কাপড়ে লাল রং করার কাজেও একে ব্যবহার করা হয়।
তবে যাই হোক, এরকম একটা উদ্ভিদের সঙ্গে দেখা পেয়ে খুব ভালোই লাগল। আর কিছুদিনের মধ্যেই আবার হারিয়ে যাবে মাটির কোনো এক তলদেশে। তবে আশা রাখি, দেখা হবে পরের কোনো এক বর্ষায়।
এখানে লেখা ভেষজ ব্যবহারগুলো শুধু জানার জন্য। কোনো রোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

মন্তব্য করুন