চুন মাখানো ইউক্যালিপটাস

Md. Siddiq Hasan অ্যাভাটার
পড়তে ৭ মিনিট
এই লেখায়

আমাদের গ্রামের বাড়িতে গরু-ছাগলের হাত থেকে গাছ বাঁচানোর জন্য গোড়া থেকে কিছুদূর পর্যন্ত সাদা চুন লাগানো হয়। ছোটবেলায় প্রায় অধিকাংশ গাছেই এই ঘটনা দেখা যেত। তবে মাঝে মাঝে দেখতাম কিছু গাছকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত পুরোটাই সাদা করে দেওয়া হয়েছে, যেন গাছকে চুনের পানিতে গোসল করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ছোটবেলার সেই সাদা গাছ

অনেক দূর থেকেই এই গাছগুলোকে দেখতে পেতাম। এমন লম্বা গাছ আর একদম আলাদা রং, চোখে না পড়ার কোনো উপায় নেই। ভাবতাম, গাছগুলো হয়তো অনেক সুস্বাদু, তাই এভাবে চুন দেওয়া হয়। কিন্তু কীভাবে? এত উঁচু গাছের ওপরে উঠে কীভাবে, আর এত নিখুঁতভাবে চুন দেয় কীভাবে? অনেক চিন্তা এলেও উত্তর অজানা। পরে বুঝতে শিখলাম, আসলে কেউ এভাবে সাদা করেনি, তার বাকলের রংই সাদা। প্রথম প্রথম মেনে নিতে কষ্ট হতো। বারবার গাছগুলোকে নেড়ে কিংবা কিছু দিয়ে একটু খোঁচা দিয়ে দেখতাম, চুন উঠে আসে কি না। কিন্তু না, কোনো দিনই এ রকম হতো না। আসলেই এটা বাকল।

আবার মাঝে মাঝে দেখতাম, গাছগুলোর ছাল নিজে নিজেই খুলে আসছে, যেমনটা দেখা যায় পেয়ারা বা অর্জুন গাছের ক্ষেত্রে। এটা যে দারুচিনির গাছ, সেই ভুল ধারণাও ছিল। আবার তেজপাতা যে এই গাছের পাতা, তা-ও ‘জানতাম’। কত কী ভুল জানতাম, আর কত উদ্ভট চিন্তা ছোটবেলায় মাথায় ঘুরত। আজ মনে হলেই হাসি আসে, কোনো কারণ ছাড়াই এক গাল হেসে নিই।

রাস্তার ধারে এক প্রতিবেশীর বাসা, আর বাসার পাশে বিশালাকৃতির এই গাছ। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এর পরিচয় কী, নাম কী, কিন্তু কোনো তথ্যই তিনি দিতে পারেননি। এই গাছ যে তিনি বা তাঁর বাবা কেউ লাগাননি, সেটা বলেছিলেন। রাস্তার ধারে হওয়ায় যখনই যেতাম, দেখা হতো এই গাছের সঙ্গে। খুব পরিচিত হয়ে গিয়েছিলাম এই অপরিচিত বন্ধুর সঙ্গে।

আরেকটু বড় হলাম, হাইস্কুলে যেতে লাগলাম। তখন দেখলাম বাজারের একপাশে এই গাছ আছে কয়েকটি। সেখানে আসা-যাওয়া ছিল বলে কিছুদিন পর এক ব্যক্তির কাছে এর পরিচয় জানলাম, এর নাম নাকি ইউক্যালিপটাস। তাঁকে এটা দারুচিনির গাছ বলে প্রথমে একটু লজ্জিতও হয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, এই গাছ তেলের জন্য লাগানো হয়। তেল বলতে খাবার তেল, গাড়ির তেল, নাকি মাথায় দেওয়ার তেল? অনেক তেলের কথা মনে ঘুরেছিল, কিন্তু সাহস করে আর জিজ্ঞেস করা হয়নি। জিজ্ঞেস করলেই তো আবার কী না কী বলে, আবার লজ্জিত হতে হবে। এখানেই সাদা দেহের ইউক্যালিপটাস সম্পর্কে জানার ইতি টেনেছিলাম, কারণ আর কোনো তথ্য পাইনি।

সেমিনারে নতুন করে পরিচয়

এক ধাপে ইউনিভার্সিটি জীবনে এসে এই পরিচিত বন্ধুর নাম আবার শুনলাম এক সেমিনারে। ফরিদ উদ্দিন আহমেদ স্যার ইউক্যালিপটাস নিয়ে অনেক কিছু বলেছিলেন। ইউক্যালিপটাস গাছের কাণ্ড অনেক পুরু হয়, অর্থাৎ এর কাঠ অন্য গাছের তুলনায় অনেক মজবুত ও টেকসই। এই গাছ যে প্রচণ্ড পরিমাণে পানি শোষণ করে, সেটাও তাঁর কাছে জানা। এই গাছ আশপাশের বাতাসে নানা ধরনের রাসায়নিক নিঃসরণ করে, যা মশা তাড়াতে সাহায্য করে। তা ছাড়া এই গাছ থেকে ভালো মানের তেল পাওয়া যায়। তিনি আরও কিছু তথ্য দিয়েছিলেন, যা আমার ছোটবেলার সব প্রশ্নের উত্তর ছিল। ভালোই লেগেছিল। না জানতে চেয়েই উত্তর পেয়ে গেলে ভালো লাগাই স্বাভাবিক।

স্যার বলেই চলেছেন, আর সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছি। তিনি বললেন, আমাদের দেশে যেসব গাছ পাওয়া যায় বা নিজে থেকে হয়, সেগুলোর কাঠের মান খুব ভালো না। তাই বাইরে থেকে ইউক্যালিপটাসের কিছু গাছ আনা হয় এবং রাস্তার ধারে পরীক্ষামূলকভাবে লাগানো হয়। তিনি আরও বললেন, আমাদের দেশে এই গাছ নিয়ে অনেক ভুল ধারণা আছে, যেমন এই গাছের নিচে নাকি অন্য কোনো গাছ হয় না, যা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আগে ধানখেতে ছায়াদানকারী গাছ হিসেবে লাগানো হলেও এখন শুধু সেই ভ্রান্ত ধারণার জন্যই এই কাজে নিরুৎসাহিত করা হয়। হ্যাঁ, এটা সত্যি যে এটি তীব্র পানিগ্রাসী গাছ। অন্যান্য গাছের তুলনায় প্রায় তিন-চার গুণ পানি শোষণ করে। এর কাঠ এতটাই নিরেট যে মাঝে মাঝে করাতকলে মেশিন নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে এই গাছের কাঠ সহজে নিতে চায় না। স্যার আরও কী কী বলেছিলেন, এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।

লেবুর ঘ্রাণের পাতা

যাই হোক, এই সুন্দর গাছটির সঙ্গে কাটানো সময় এখানেই থেমে থাকেনি। এই তো কিছুদিন আগের কথা, ক্যাম্পাসের টিএসসিতে বন্ধুদের সঙ্গে বসে আছি, সবাই গল্পগুজব করছি, হঠাৎ ইউক্যালিপটাস গাছের একটা পাতা আমার পাশে এসে বসল। তার রূপটা খুব সুন্দর, বাঁকা চাঁদের মতো। মনে হলো পাতাটা যেন নিঃশব্দে বলছে তাকে হাতে তুলে নিতে। তুলে নিলাম, আর হাতে নিতেই কোথা থেকে লেবুর তীব্র ঘ্রাণ নাকে এল। আশপাশে ঝালমুড়ি কিংবা বারোভাজাওয়ালা এল কি না দেখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু না তো, তারা কেউ নেই। তাহলে এই ঘ্রাণ এল কোথা থেকে? এই পাতাটা নাকি?

দেরি না করে এক পাশ চিরে দিলাম। ঘ্রাণ আরও তীব্র হলো। আরও কিছু পাতা খুঁজে সেগুলোও চিরে নিশ্চিত হলাম, হ্যাঁ, ঘ্রাণটা এই পাতারই। নিশ্চিত হয়ে আরও আশ্চর্য হলাম: ইউক্যালিপটাসের পাতায় কীভাবে লেবুপাতার মতো ঘ্রাণ হয়?

পাশে শহিদুল ইসলাম শামীম, তাহমিদ চৌধুরী রাসিফ, কনক কান্তি দাস ছিল। তাদের পাতা ধরিয়ে দিয়ে বললাম, দেখো, তোমরাও কি একই ঘ্রাণ পাও? তারাও আশ্চর্য হলো। পরেরবার চা খেলে এর পাতা দিয়ে দেব, তাহলে লেবু চা মনে হবে, এই নিয়ে কত মজাও হলো।

কিছুদিন থেকে বেশ ভালো মানের ঝড় যাচ্ছে। যে হারে কার্জন হলের গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ছে, তাতে ভয় হয়, আমার জীবনের জন্য না, গাছগুলোর জন্য। গাছগুলোর জন্য মায়া হয়: বিশাল বিশাল ডালপালা পুরো ভেঙে যাচ্ছে, বড় বড় গাছ গোড়া থেকে উপড়ে যাচ্ছে। গতকাল ইউক্যালিপটাসের একটা বড় ডাল ভেঙে পড়েছিল। তাতে খুব সুন্দর থোকায় থোকায় ফুল ফুটে ছিল। সাদা, গোলাকার, কিছুটা জামরুলের ফুলের মতো। ঠিক আছে, মানছি, ফুলগুলোর ছবি তোলার সুযোগ পেয়ে একটু খুশি হয়েছি, কিন্তু এই অবস্থায় মন থেকে কোনো দিন ছবি তুলতে চাই না। দু-একটা ফুল হাতে নেওয়ায় আঙুলগুলো কালো কালো হয়ে গিয়েছিল, পরে খেয়াল করেছিলাম। কারণটা তখন অজানা ছিল।

আসল পরিচয়: Corymbia citriodora

বাসায় এসে ভাবলাম, ছোটবেলার এই বন্ধুর নামটাও ঠিকমতো জানি না, এ তো ভারি অন্যায়। খুঁজতে বসলাম, জোগাড় করতে লাগলাম তথ্য, সঠিক তথ্য।

নাম খুঁজতে গিয়ে আরেক সমস্যা: কোনটা ছেড়ে কোনটা, সবই তো মনে হচ্ছে একই গাছ। Eucalyptus alba-র সঙ্গে সবচেয়ে মিল, কিন্তু এর লেবুর মতো ঘ্রাণের কথা কোথাও উল্লেখ নেই। তাহলে কী করি? আমার পার্সোনাল হেল্পলাইনে যোগাযোগ করলাম, হ্যাঁ, শামীমকে বললাম এই ইউক্যালিপটাসের আসল পরিচয় দিতে। এই কয়েক দিন মনে করেছিলাম ইউক্যালিপটাসের পাতা মানেই লেবুর মতো ঘ্রাণ, কিন্তু এটাও সঠিক না। আসলে শুধু লেমন ইউক্যালিপটাসের পাতায় এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, অন্য কোনোটাতে না। এর বৈজ্ঞানিক নাম Corymbia citriodora (Hook.) K.D. Hill & L.A.S. Johnson। নামেই তার পরিচয়: citriodora শব্দের অর্থ লেবুর মতো সুগন্ধি। এর সমনাম Eucalyptus citriodora Hook.।

মজার বিষয় হলো, কিছু বিজ্ঞানী এটিকে Eucalyptus maculata প্রজাতির এক ভ্যারাইটি মনে করতেন, যা পরে ভুল বলে জানা যায়। কথায় কথা আসে, তাই আরও কিছু না বললেই নয়। বাস্তবে Myrtaceae পরিবারের এই গাছগুলোকে ইউক্যালিপটাস নামে ডাকা হলেও এগুলো প্রকৃত ইউক্যালিপটাস না। ১৯৯০-এর দশকের আগ পর্যন্ত এই পরিচয় থাকলেও আণবিক গবেষণার পর দেখা যায়, Corymbia গণের গাছগুলো Eucalyptus থেকে একটু ভিন্ন এবং Angophora গণের সঙ্গে বেশ মিল, তাই এই তিনটি গণকে একত্রে ইউক্যালিপ্টস (eucalypts) বলা হয়। পরে এই উদ্ভিদের ক্ষেত্রে ভুল সংশোধন করা হলেও আজও এগুলো ইউক্যালিপটাস পরিচয়েই আছে। এই উদ্ভিদ অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তাসমানিয়ার এন্ডেমিক হলেও প্রায় সারা পৃথিবীতেই বিস্তৃত।

গুণাগুণ

এই উদ্ভিদ বেশ কিছু গুণের জন্য বিখ্যাত। এই গাছের তেল সাইট্রোডিওয়েল নামে পরিচিত এবং এতে প্রায় ৩১ রকমের যৌগ শনাক্ত করা হয়েছে, যার ৮১.৩ শতাংশই সাইট্রোনেলাল নামে এক বিশেষ যৌগ, যদিও বিভিন্ন স্থানের গাছের ক্ষেত্রে এতে সামান্য পার্থক্য হতে পারে। এ ছাড়া সাইট্রোনেলল, সাইট্রোনেলিল অ্যাসিটেট, আলফা-টারপিনিওল, লিমোনিন, বিটা-পাইনিন, আলফা-পাইনিন, পি-সাইমিন, স্প্যাথুলেনল, পলিফেনলিক অ্যাসিড-জাতীয় যৌগ পাওয়া যায়। বিভিন্ন পোকামাকড়, বিশেষ করে মশার উপদ্রব থেকে রক্ষা করে এই তেল। পরিণত বয়সে পাতা থেকে প্রাকৃতিকভাবে p-menthane-3,8-diol নিঃসৃত হয় বলে এই গাছের চারপাশে মশা থাকে না। তা ছাড়া এই তেল প্রাকৃতিক প্রিজারভেটিভ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। দুর্গন্ধনাশক গুণ থাকায় মাঝে মাঝে কিছু স্প্রের উপাদান হিসেবেও এর নাম শোনা যায়।

ইউক্যালিপটল উপাদানটি থাকায় কফ, ঠান্ডা, গলার খুসখুসে ভাবের জন্য ইউক্যালিপটাস বিশ্বখ্যাত। ব্রংকাইটিস, হাঁপানি, সাইনুসাইটিসের চিকিৎসায় এর ব্যবহার বেশ ফলপ্রসূ। তা ছাড়া কাটাছেঁড়ায় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল, অ্যান্টিসেপটিক, অ্যান্টিফাঙ্গাল হিসেবে কাজ করে।

ও, আচ্ছা, বলাই হয়নি, একদম ভুলে গিয়েছিলাম, এই ইউক্যালিপ্টসগুলোকে গাম ট্রি নামেও ডাকা হয়। এর ডালপালা ভাঙলে একধরনের আঠালো পদার্থ বের হয়, তাই সেদিন ফুল হাতে নেওয়ায় হাতে কালো দাগ হয়ে গিয়েছিল। দিন শেষে এই গাছের প্রতি ভালোবাসা আরও বেড়ে গেল, আর সে জায়গা করে নিল আমার মনের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ বাড়ির পাশেও।

এখানে লেখা ভেষজ ব্যবহারগুলো শুধু জানার জন্য। কোনো রোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

তথ্যসূত্র

  1. এন. এস. নওরোজ জাহান (২০০৭), বাংলাদেশের ফুলের রাজ্য।
  2. Encyclopedia of Flora & Fauna of Bangladesh, vol. 9.
  3. Abdul Ghani (2003), Medicinal Plants of Bangladesh, Asiatic Society of Bangladesh.
  4. https://en.wikipedia.org/wiki/Corymbia_citriodora
  5. https://www.researchgate.net/publication/264868532
  6. https://www.researchgate.net/publication/226503551
  7. https://www.researchgate.net/publication/325718228
Md. Siddiq Hasan অ্যাভাটার

লিখেছেন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।