আজ অফিস শেষে বাসায় ফিরছি। একে তো গরম, তার ওপর জ্যামের রাস্তা। অনেকক্ষণ ধরে বসে আছি। হঠাৎ ‘ঢাকা শহরের মানবসৃষ্ট সবচেয়ে বড় দানব’ কথাটা মনে পড়ে গেল। বসে বসে আশপাশে চেয়ে দেখা ছাড়া কী আর করার। রাস্তার দুদিকে বহুতল ভবনের সারি, আর রাস্তার মাঝে চিকন একটা বিভাজক, যেখানে কিছু গাছপালা আছে। বহুতল ভবন আর দেখতে মন চায় না, তাই সেই গাছপালাই দেখছি। তবে যতই দেখছি, ততই মর্মাহত হচ্ছি। যে কটা গাছ চোখে পড়ল, কোনোটার ডাল ভাঙা, কোনোটার পাতা ধুলোময়লা আর গাড়ির কালো ধোঁয়ায় জীর্ণশীর্ণ, কোনোটার পাতা গাড়ির তাপে, বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে পুড়ে ঝলসে গেছে, আর কোনোটা নিচে মাটি না পেয়ে, চারপাশে বাড়ার জায়গা না পেয়ে মৃতপ্রায়।
বেচারা গাছগুলো, কী কষ্টের জীবন তাদের! সবাই ধুঁকে ধুঁকে মরছে। কোনো এক কালে গাছপালা ঘেরা পরিবেশে বড় হয়েছি, পাশাপাশি উদ্ভিদবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছিলাম বলে হয়তো গাছপালার প্রতি দরদ একটু বেশি, তাই হয়তো তাদের এই করুণ দশা আর সহ্য হলো না। বেশ কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে সিটে হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে আছি। পাশের লোকটা ঝিমুনি দিয়ে বারবার গায়ে এসে পড়ায় বিরক্ত লাগল, তাই সিট থেকে উঠে দাঁড়ালাম। এমনিতেও বাসা আর বেশি দূরে না। ভাবলাম হেঁটে গেলে হয়তো আগেই পৌঁছাব। সিট ছেড়ে বেরোতেই মাঝের লেনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো সেই সিটে বসার জন্য ঠেলাঠেলি শুরু করে দিল। কোনো রকমে ভিড় ঠেলে বাস থেকে নামলাম। ফুটপাতের ভিড় দেখে মনে হলো, আমার মতো আরও অনেকেই ‘সামনেই বাসা’ বলে নেমে পড়েছে। সেই ভিড়ের সঙ্গে পিঁপড়ার মতো একজনের পেছনে আরেকজন সারি ধরে বাসার দিকে যাচ্ছি।
ফুটপাতের দোকানে ছোটবেলার সবজি
যেতে যেতে প্রতিদিনের মতো রাস্তার ধারের অস্থায়ী দোকানগুলোর দিকে একবার চোখ বুলিয়ে যাচ্ছি। কেউ মাছ নিয়ে, কেউ পোশাক, কেউ ইলেকট্রনিক সামগ্রী, আবার কেউ শাকসবজি নিয়ে ছোট অস্থায়ী দোকান দিয়েছে। অন্য সময় পাওয়া না গেলেও এই সময়ে সবাই এমন সারি ধরে বাসায় যায় বলে দোকানগুলো এই সময়েই বসে। কেনাবেচাও মন্দ হয় বলে মনে হয় না। আমিও মাঝে মাঝে ভালো কোনো সবজি পেলে বাসার জন্য নিয়ে যাই। মজার বিষয়, কেউ কিছু কেনার জন্য থামলে তার পেছনের তিন-চারজনও ধাক্কা খেয়ে আটকে যায়, এখানেও যেন এক কৃত্রিম জ্যাম বেঁধে যায়। তারপর ধীরে ধীরে ঠিক হয়, আবার কোথাও আটকায়। এভাবে একটু একটু করে এগোতে এগোতে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে যাই।
তবে আজ বাসায় পৌঁছানোর আগেই একটা দোকানের সামনে থমকে দাঁড়ালাম। এক দোকানি একটা বুনো সবজি বিক্রি করছে, যেটা সেই ছোটবেলায় খেয়েছিলাম। তখন গ্রামের বাড়িতে থাকতাম, আর বহুদিন আগের ঘটনা বলে স্বাদ কেমন সেটাও মনে করতে পারছি না। কেজিখানেক কিনে চলে আসতে যাব, ঠিক সেই সময় মনে হলো, তিনি এই জিনিস কোথায় পেলেন একটু না জেনে গেলে রাতে আবার ঘুম হবে না। দোকানিকে জিজ্ঞেস করায় সে বলল, এর আগে এই সবজি কখনো বিক্রি করেনি, আজই প্রথম এনেছে। যে তাকে এই সবজি দিয়েছে, সে তার পাশের বনজঙ্গল থেকে সংগ্রহ করেছে। সব সময় নাকি পাওয়া যায় না। তাকে আর বিরক্ত না করে চুপচাপ চলে এলাম।
যারা হারিয়ে যাচ্ছে
এমন বুনো সবজিগুলো এখন যেন সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বেশি, যেকোনো পরিবেশে টিকে যাওয়ার দক্ষতা বেশি, খরা-বন্যাও সহ্য করতে পারে, কিন্তু তারপরেও এরা অনাদরে, অবহেলায় বেড়ে ওঠে, কারণ দুর্ভাগ্যজনকভাবে এদের ফলন কম। সত্যি বলতে, এদের ফলন মোটেও কম না, এদের ফলনই স্বাভাবিক। কিন্তু বাজারে উচ্চ ফলনশীল কিছু সংকর জাত আসায় তাদের সঙ্গে তুলনা করে এদের ‘কম ফলনশীল, নিম্নমানের বুনো সবজি’ বলে আর চাষ করা হয় না। তাই এরা হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ উচ্চ ফলনশীল সংকর জাতের সবজির শুধু ফলনক্ষমতাই আছে, অন্য কোনো গুণ নেই বলে অধিক যত্নের প্রয়োজন হয়। বৈরী আবহাওয়া এরা সহ্য করতে পারে না। পোকামাকড় বা খরা-বন্যা হলেই এসব সবজি আর টিকতে পারে না, শেষে খাদ্যাভাব দেখা দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বন্ধুদের সঙ্গে মজা করে বলতাম, এই বুনো সবজিগুলো হলো সেই শিক্ষার্থীরা, যারা বুঝেশুনে পড়াশোনা করে, জ্ঞানের গভীরে যায়, পারিপার্শ্বিক সব কাজে অবদান রাখে, সহশিক্ষা কার্যক্রমে পুরোদমে জড়িত, কিন্তু এদের ফলন কম, মানে রেজাল্ট হয়তো গড় বা তার চেয়ে সামান্য ওপরে। আর যাদের ফলন সর্বোচ্চ, মানে সিজিপিএ ফোর, তারা শুধু চারটা বছর পড়ালেখাই করেছে। প্রাপ্তির খাতায় আর কিছু নেই। যদিও কিছু ব্যতিক্রমও আছে, যারা সবদিক দিয়েই সেরা, তাই তো প্রবাদ আছে, যারা রাঁধে তারা চুলও বাঁধে। আসলে আমি এই দুটোর কোনোটাতেই ছিলাম না। কোনো রকমে টেনে চারটা বছর পাস করেছি, তাই তাদের এসব বলে খুব মজা পেতাম। আজ তাদের কেউ উচ্চশিক্ষায় দেশের বাইরে, কেউ গবেষণায় মগ্ন, আর বাকিরা বেশির ভাগই আমার মতো একটা ছোটখাটো চাকরি করেই জীবন পার করছে। বন্ধুদের সঙ্গে মজার আড্ডার এই পুরোনো স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে ওঠায় একটু স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লাম। এক পা, দুই পা করতে করতে কখন যে বাসার সামনে চলে এলাম, বুঝতেই পারলাম না।
শেষমেশ বাসায় গিয়ে গিন্নির হাতে বুনো সবজিটা ধরিয়ে দিয়ে রান্না করতে বললাম। সে একটু গরম হলো। বাজারে যা বিক্রি হয় না, তুমি তা-ই কিনে নিয়ে আসো! পারব না এসব ঘাস রান্না করতে। তারপর রাতের খাবারে সেই রান্না করা বুনো সবজিই দুজনে তৃপ্তি নিয়ে খেলাম। তাকে বলতে যাব, ঠিক সেই সময় সে-ই বলল, থাক, আর বলতে হবে না। বুনো সবজির বিচিগুলো তুলে রেখেছি, কাল ছাদের টবে লাগিয়ে দেব। ও, কাল তো তোমার অফিস বন্ধ, নিজেই লাগিয়ে নেবে। মাটি রেডি করে ছাদের ডান কোনায় রাখা আছে। আর কাল ছাদে গিয়ে দেখবে, আগের নিয়ে আসা বুনো কাঁকরোলের যে ফলগুলো এসেছে, সেগুলো খাওয়ার উপযোগী হয়েছে কি না। হলে পেড়ে বাসার মালিককে কিছু দিয়ে আসবে। ঘুমাতে যাওয়ার আগে পুরোনো অভ্যাসমতো শুয়ে শুয়ে ডায়েরিতে আজকের ঘটনা লিখছিলাম, কিন্তু আর বেশি কিছু লেখা হয়ে উঠল না। অবশেষে বয়সের কাছে হার মেনে ঘুমের জগতে প্রবেশ করলাম।

মন্তব্য করুন