মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনে আমি, মুহাম্মদ সিদ্দিক জামান, শহিদুল ইসলাম শামীম আর মেহরান সামিউল ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছি, আরও গভীরের দিকে। একদম নিশ্চুপ জায়গা, শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যায়, আর কিছু নয়। হঠাৎ একটা মিষ্টি ঘ্রাণ নাকে এল। চারপাশে দেখলাম, কিছু খুঁজে পেলাম না, কিসের এই সুবাস? আরেকটু সামনে যেতেই জামান বলে উঠল, একটা মিষ্টি ঘ্রাণ পাচ্ছি, কেউ পাচ্ছ? আমিসহ সবাই সাড়া দিলাম, পাচ্ছি তো, কিন্তু কিসের, আর কোথা থেকে আসছে, সেটা এখনো চোখের আড়ালে।
যাই হোক, কোনো দিকে আছে হয়তো। জুতা পরে না যাওয়ায় রাস্তা ছেড়ে ভেতরে গিয়ে খুঁজে বের করার ইচ্ছাও হচ্ছিল না, তাই আশপাশে না দেখে রাস্তা ধরেই সামনে যেতে থাকি। সামনে যেতেই রাস্তার ওপর কিছু ফুল পড়ে থাকতে দেখলাম। প্রথমে এই ফুল আমাকে বোকা বানিয়েছিল তার রূপের মায়াজালে। দেখে মনে করেছিলাম অর্নামেন্টাল ফুল, দোকানে যেগুলো বছরের পর বছর রাখা থাকে, কিছু হয় না।
এ রকম ফুল দেখে আনন্দ পাওয়াই স্বাভাবিক। পাপড়িগুলোর মধ্যে যেন কেউ সুন্দর করে আলপনা এঁকে দিয়েছে। আমি যে ফুল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে গেছি আর বাকিরা সামনে চলে গেছে, সেটা আমিও খেয়াল করিনি, তারাও করেনি। হঠাৎ শামীম বলে উঠল, হাসান, তুমি কী করো, এসো। তখন তাদের ফুলটা দেখালাম। রাস্তার ধারে আরও অনেক পড়ে আছে। একটু নাকের কাছে নিতেই সেই মিষ্টি ঘ্রাণের উৎস পাওয়া গেল, এই সেই, যার এত সুবাস। কিন্তু এর উৎস কী?
কার ফুল এটি? আশপাশে অনেক গাছগাছালি, কিন্তু কোনোটাতেই তো ফুল দেখছি না। তাহলে কি গত দিনের তীব্র ঝড়ে অন্য কোথাও থেকে উড়ে এসেছে? এদিক-ওদিক দেখার পর যখন মাথার ওপর সূর্যের জমকালো আলো ভেদ করে তাকালাম, তখন বুঝলাম কিছু ফুল একটি গাছের ডালের অগ্রভাগে রয়ে গেছে। সেই বিশাল গাছ, বিশালাকৃতির দেহ। যতদূর চোখ যায়, কাণ্ডে কোনো শাখা-প্রশাখা নেই, একদম উঁচুতে গিয়ে কিছু ডালপালা। আশপাশের বাকি গাছগুলোও একই রকম। দেখে মনে হচ্ছিল, যেন কোনো বৈদ্যুতিক খুঁটির ওপর কেউ কয়েকটা ডালপালা রেখে দিয়েছে। মানে কেউ যদি মনে মনে এই ফুল পাড়তে চায়, কোনো উপায় নেই। সে ইচ্ছা কোনো দিন পূরণ হবে কি না সন্দেহ। গাছের গায়ে পরিচিতিমূলক নামফলক ছিল: টেলিয়া গর্জন, বৈজ্ঞানিক নাম Dipterocarpus turbinatus।
গর্জনের পরিচয়
আমাদের দেশে এর প্রচলিত নামের মধ্যে গর্জন, কালি গর্জন উল্লেখযোগ্য। কাঠের জন্য বিখ্যাত ডিপটেরোকারপেসি (Dipterocarpaceae) পরিবারের সদস্য এই উদ্ভিদ। আমাদের দেশসহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে এর ভালো উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
সাধারণত এই উদ্ভিদ ৩০ থেকে ৪৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর লাল-বাদামি কাণ্ড অন্য গাছের কাণ্ড থেকে একে আলাদা করে তুলেছে।
এর কাণ্ডের প্রাথমিক যৌগ হিসেবে পাওয়া যায় অলিও-রেজিন, যা গর্জন বালসাম নামে পরিচিত। এ ছাড়া পাওয়া যায় অত্যাবশ্যক তেল, যাতে থাকে হাইড্রোকার্বন, বিটা-ক্যারিওফাইলিন, হিউমুলিন, কিছু সেসকুইটারপিন ও সেসকুইটারপিন অ্যালকোহল। বাকল ধারণ করে বারজেনিন (bergenin)। বীজ ইউরিয়েজের এক বিশাল আধার হিসেবে পরিচিত।
গুণাগুণ ও ব্যবহার
এই উদ্ভিদ থেকে যে তেল পাওয়া যায়, তা গর্জন তেল নামেও পরিচিত। কম্বোডিয়ায় এর শক্ত রেজিন ব্যবহার করে বিভিন্ন বস্তু, বিশেষত মশাল বানানো হয়। তা ছাড়া এর কাঠ থেকে প্লাইউড তৈরি হয়। বিভিন্ন দেশে এটি গনোরিয়া, কুষ্ঠসহ অন্যান্য চর্মরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। দাদ রোগে এর ব্যবহার বেশ ফলপ্রসূ। বাতের সমস্যা আর গ্লিট (একধরনের সংক্রমণ) থেকে রেহাই পেতেও গর্জনের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
চীনসহ বিভিন্ন দেশে গর্জন শোভাবর্ধক আর ভেষজ, দুই কারণেই রোপণ করা হয়। আমাদের দেশে কী উদ্দেশ্যে লাগানো হয়, সেটা না হয় আমাদের না জানলেও চলবে।
এখানে লেখা ভেষজ ব্যবহারগুলো শুধু জানার জন্য। কোনো রোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
তথ্যসূত্র
- Encyclopedia of Flora & Fauna of Bangladesh, vol. 7.
- Abdul Ghani (2003), Medicinal Plants of Bangladesh, Asiatic Society of Bangladesh.
- https://en.wikipedia.org/wiki/Dipterocarpus_turbinatus
- https://www.researchgate.net/publication/271642103

মন্তব্য করুন