আব্দুল্লাহ, আব্দুল্লাহ…
ওই সকাল সকাল শুরু হয়ে গেল ডাকাডাকি। আর ভালো লাগে না। বিরক্তির স্বরে বলল, কী হলো? আসছি।
বাবা, আমার চশমাটা একটু দিয়ো তো, কেন খুঁজে পাচ্ছি না।
তোমার বিছানার পাশেই আছে। আর কিছু?
না বাবা, আর কিছু না।
তাহলে গেলাম আমি, আমার অনেক কাজ আছে।
ছেলেটার এমন ব্যবহার মাঝে মাঝে খুব কষ্ট দেয়। অথচ যখন হাঁটতে পারতাম, তখন কী ভালোবাসত আমাকে! কাজ থেকে বাসায় ফিরলে আমাকে জড়িয়ে ধরে কত গল্পই না বলত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু কেমন যেন বদলে যায়। আমাদের কাছে সন্তানেরা জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলেও তাদের কাছে আমাদের মূল্য হয়তো দাবা খেলার বড়ের (pawn) সমান, বা তার চেয়েও কম। তবু কিছুই করার নেই, সবই নিয়তি। সবকিছু এভাবেই চলে আসছে, এভাবেই চলবে।
চশমাটা পরতেই ফোনের নোটিফিকেশনগুলো চোখের সামনে স্পষ্ট হলো। এতক্ষণ আবছা ছিল, অনুমান করে পড়ছিলাম। ব্যাংক থেকে টাকা তোলা হয়েছে। হয়তো সে-ই তুলেছে, তবে পরিমাণটা গত মাসের চেয়ে অনেক বেশি মনে হলো। এভাবে টাকা তুলতে থাকলে আর কয়েক মাসের মধ্যেই টাকা শেষ হয়ে যাবে। বিকল্প কোনো ব্যবস্থা খুব শিগগির করতে হবে, নইলে সংসার খরচ চালানো কষ্টকর হয়ে উঠবে। আজ পা দুটো ঠিক থাকলে এই নিয়ে কোনো চিন্তাই করতে হতো না। কিন্তু ওই যে, নিয়তির খেলা। যখনই পায়ের কথা মনে হয়, সব ঘটনা যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বন্ধুটার জন্য দুঃখ হয়, প্রচণ্ড দুঃখ।
আমি আর আমার বন্ধু একসঙ্গে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি চাকরিও করতাম একই কোম্পানিতে। এক প্রজেক্টের কাজে আমাদের এক টিম নিয়ে পাহাড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কীভাবে যেন পা পিছলে একজন আমাদের ওপর এসে পড়ল। সামাল দিতে না পেরে আমরা পাহাড়ের চূড়া থেকে নিচে পড়ে গেলাম। উচ্চতা বেশি না হলেও পাথুরে জায়গায় পড়ায় আমার সেই বন্ধু সঙ্গে সঙ্গেই মারা গেল, আর আমি প্রাণে বেঁচে গেলেও স্পাইনাল কর্ডে গুরুতর আঘাতে চিরতরে হাঁটাচলার ক্ষমতা হারালাম। এখনো মনে পড়ে, সে আমাকে ধরার চেষ্টা করতে গিয়েই আমার সঙ্গে পড়ে যায়।
হঠাৎ ঘরের দরজা খুলে যায়। সে এসেছে। তাকে দেখে একটু অবাক হই, কারণ ইদানীং সে আমার কাছে খুবই কম আসে। এসেই বলতে শুরু করল, তোমার ব্যাংকের টাকা শেষ, আর মাত্র কয়েক হাজার টাকা আছে। কীভাবে কী করবে? অন্য কোনো অ্যাকাউন্টে টাকা আছে কি?
এখানে বিছানার পাশে একটু বসো, অনেক ক্লান্ত দেখাচ্ছে তোমাকে। মনে হলো বলি, কতদিন ভালোমতো তোমাকে দেখি না, কিন্তু বলার আগেই সে বলে উঠল:
আমার বসার সময় নেই, বাড়ির অনেক কাজ বাকি, আমি আসি। বলেই চলে গেল।
এমনটা বলবে, আশা করেছিলাম। অথচ এই তিন বছর আগেও রাতে বাড়ি ফিরে সব কাজ ফেলে আমার কাছে এসে বসে থাকত। বলত, কাজ পরে হবে, আগে বলো সারাদিন কেমন গেল। আগে সে-ই আমার যত্ন নিত। এখন আমাকে দেওয়ার মতো সময় তার হয় না বলে গত বছর একটা কাজের লোক রাখল, টুকটাক যা লাগে করে দেয়। একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে, অন্তত তার অবহেলার ব্যবহারটা কম দেখতে হয়।
এখন অবশ্য সারাদিন মোবাইলেই সময়টা কেটে যায়, ভালোই। আগে বই পড়তাম, এখনো পড়ি, তবে মোবাইলে। বই কেনার টাকাটা বাঁচে।
সবকিছুই সময়সাপেক্ষ।

মন্তব্য করুন