আগে যখন খালাতো ভাই আরিফুলের বাসায় থাকতাম, তখন কার্জন হলে আসতাম নীলক্ষেত হয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটির তোরণের রাস্তা ধরে। দুই রাস্তার মাঝে লাগানো নানা ধরনের উদ্ভিদের দেখা পেতাম বলে হাঁটতে ভালোই লাগত। কোনটার পরে কোনটা আছে, একদম যেন মুখস্থই হয়ে গিয়েছিল। তখন সবগুলোর নাম না জানলেও উদ্ভিদগুলো পরিচিত হয়ে উঠেছিল।
হঠাৎ একদিন দেখলাম, রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের গেটের সামনে, যেখানে দুই রাস্তার মাঝের লনটা শেষ হয়েছে, সেখানে খুব সুন্দর ফুল ফুটেছে। সাদা রঙের ফুল। ফুলটার একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। পাপড়িগুলো চারপাশে এমনভাবে ছড়িয়ে আছে, দেখে মনে হয় একটা অক্টোপাস তার হাতগুলো চারদিকে ছড়িয়ে রেখেছে, অথবা একটা মাকড়সা তার আট পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর হলুদ রঙের পুংকেশরগুলো সেই ছড়ানো পাপড়ির ফাঁক দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আছে।
অক্টোপাস নাকি মাকড়সা
যে উদ্ভিদটাতে এই ফুলগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, সেটা দেখতে কিছুটা ঘৃতকুমারীর (Aloe vera) মতো হলেও দুটো উদ্ভিদে অনেক পার্থক্য আছে। পাতাগুলোও নজরকাড়া। এই ধরনের পাতা আগেও দেখেছি, কিন্তু এত বড় দেখিনি। একদম লম্বা, পুরু বাঁশপাতার মতো, কিন্তু বিশাল সাইজের, মসৃণ আর তেল চুকচুকে সবুজ। হাত দিয়ে মাপতে গিয়ে দেখি পাতার তুলনায় হাতই ছোট। অনেকক্ষণ দেখার পর একটা ছবি তুলে আবার ক্লাসের উদ্দেশে রওনা দিলাম। যেতে যেতে দেখি আরও বিভিন্ন জায়গায় এই উদ্ভিদে ফুল ধরে আছে। দেখে ভালোই লাগছিল।
যেতে যেতেই আবার মনে হলো, এই ধরনের পাতাওয়ালা উদ্ভিদ তো জুওলজি ডিপার্টমেন্টের সামনেও দেখেছি। তাহলে সেখানে গিয়ে ফুলগুলো নিয়ে আরও কিছু সময় ভাবা যাবে। গিয়ে দেখলাম পাতা একই ধরনের হলেও সেখানে এখনো পুরোপুরি ফুল আসেনি, শুধু কুঁড়ি হয়েছে। কিন্তু কুঁড়িগুলোর রং সাদা না, একটু লাল কিংবা ম্যাজেন্টা। এখন কী করা যায়? দুটোই কি একই উদ্ভিদের আলাদা আলাদা রঙের ফুল, নাকি দুটো আলাদা প্রজাতি? এই নিয়ে মহা বিপদে পড়লাম। নামই জানি না, তার ওপর আবার এই সমস্যা। তখন এই নিয়ে আর বেশি চিন্তাভাবনা করিনি।
বইয়ের পাতায় পরিচয়
কিছুদিন পর একটা বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতেই চোখে পড়ল সেই ফুলের পরিচয়। নাম দেওয়া ছিল সুখদর্শন। ফুলটি দেখলে সুখ পাওয়া যায় কি না জানি না, তবে নামটা খুব সুন্দর। আরেকটি নাম বড় কানুর। বৈজ্ঞানিক নাম Crinum asiaticum। ইংরেজি নামের সঙ্গে আমার কল্পনা মিলে গেল: spider lily, giant crinum lily। কিন্তু আরেকটা ইংরেজি নাম দেখে একটু চিন্তায় পড়লাম। নাম দেওয়া ছিল poison bulb। তাহলে কি এর দেহটাই বিষাক্ত?
আগের দিন তো অনেকক্ষণ পাতা ধরে নাড়াচাড়া করেছিলাম, এবার কী হবে ভেবে একটু ভয়ই পেয়েছিলাম। এর রস ত্বকে লাগলে নানা রকম জ্বালাপোড়া হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, আর খেয়ে ফেললে পাকস্থলীতে সমস্যা, সঙ্গে সঙ্গে বমি, পেটের পীড়া, এমনকি ডায়রিয়া পর্যন্ত হয়ে যেতে পারত। ভাগ্যিস খেয়ে দেখিনি, ভেবে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। কেউ না জেনে অতিরিক্ত পরিমাণে ব্যবহার করলে প্যারালাইজড পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। শামীম সব সময়ই বলে, অপরিচিত কোনো কিছু দেখলে মুখে দিবা না। যাক, তার কথা শুনে বেঁচে গেছি তাহলে।
লিলি নামের লিলি নয়
সুখদর্শন Amaryllidaceae পরিবারের সদস্য দেখে একবার একটু সন্দেহ হলো। সাধারণত বাল্ব জাতীয় উদ্ভিদগুলো Liliaceae পরিবারের সদস্য হয়, কিন্তু এটা আবার কোন পরিবারের কথা বলছে? সঠিক তথ্য জানার জন্য অনেক কিছু খুঁজতে শুরু করলাম। পরে জানতে পারলাম, নাম স্পাইডার লিলি হলেও এটা সত্যিকার অর্থে লিলি না। দেখতে কিছুটা লিলির মতো, তাই রূপক নাম তার।
টিএসসির গোলাপি অপরূপা
পরে একদিন টিএসসিতে কী একটা কাজে যেন গিয়েছিলাম। ক্যাফেটেরিয়ার দিকে যাব বলে মেইন গেট দিয়ে ঢুকতেই ডানে একটা ফুলের দিকে চোখ গেল। কিছুক্ষণ ভাবলাম, এটাই কি সেই গোলাপি সুখদর্শন, যেটা ফোটার অপেক্ষায় এতদিন জুওলজির সামনে সময় দিচ্ছিলাম? মনে মনে ভাবলাম, ভালোই হলো, অবশেষে তাহলে পেয়ে গেলাম। সেই অপরূপার ছবি তুলে নিলাম। তবে আরেকটা বিষয় খেয়াল করলাম, এটির ফুলও সাদাটার তুলনায় বড়, পাতাও বড়। দেহের চেয়ে পাতা তিন-চার গুণ বড়। তবে বাকি সবকিছু হুবহু একই রকম।
অবশেষে বুঝতে পারলাম, এই দুটো উদ্ভিদ আসলে আলাদা প্রজাতি। এটি লাল স্পাইডার লিলি, লাল সুখদর্শন, বৈজ্ঞানিক নাম Crinum × amabile। আর হ্যাঁ, এটি একটি সংকর প্রজাতি। আমার কাছে দুটোই বেশ পছন্দ হয়েছে।
বিষ আর ভেষজ
যা-ই হোক, সুখদর্শনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ যৌগ আছে। এর রাইজোমে লাইকোরিন, ক্রিনিন, ক্রিনামিন, হিম্যানথামিনের মতো বেশ কিছু অ্যালকালয়েড পাওয়া যায়। কন্দে থাকে হিপিয়াস্ট্রিন, পাতায় চেরিলিন, আর বীজে ক্রিনামিন ও লাইকোরিন।
আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিষাক্ত হলেও এই সুখদর্শনের লোকজ চিকিৎসায় নানা ব্যবহার আছে। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার কথা অনেক শুনেছি, কিন্তু বিষাক্ত একটা গাছ যে ওষুধের কাজেও লাগে, সেটা এই প্রথম দেখলাম। লোকজ চিকিৎসায় এর পাতার রস নাক-কানের ব্যথায় ব্যবহার করা হয়। যাদের প্রস্রাব কম হয়, তাদের জন্যও এই উদ্ভিদ ব্যবহারের চল আছে। অনেকের নখের গোড়ায় ইনফেকশন হয়, সেখানেও সুখদর্শনের পাতা লাগানোর প্রচলন আছে। তবে যেহেতু বিষাক্ত, তাই অভিজ্ঞতা ছাড়া এই ধরনের চিকিৎসা করে আমি অন্তত ঝুঁকি নেব না।
তা ছাড়া সুখদর্শনের ঘ্রাণ আমার পছন্দ হয়েছে। একটু বিষাক্ততা থাক, কিন্তু এই রকম উদ্ভিদ একটা বাগানে থাকলে কন্দ দিয়ে প্রতিবছরই নতুন নতুন চারা বানিয়ে বড় করতে পারব। আর সুখদর্শন বহুবর্ষজীবী হওয়ায় একটা থেকে অনেক অনেক সুখের দেখা পাওয়া যাবে, এই আশা রাখি।
এখানে লেখা ভেষজ ব্যবহারগুলো শুধু জানার জন্য। কোনো রোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

মন্তব্য করুন