সত্যিই ধূপের গাছ হয়!

উপন্যাস অ্যাভাটার
পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায়

ছোটবেলায় স্কুলে যাওয়ার পথে একটা মন্দির পড়ত। মন্দিরটার পাশ দিয়ে যেতেই খুব সুন্দর একটা সুগন্ধ নাকে এসে লাগত। মাঝে মাঝে একটু উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করতাম, এত সুন্দর সুগন্ধটা আসলে কিসের। দেখতাম ভেতরে মাটির হাঁড়ির মতো একটা পাত্রে কিছু একটা পোড়ানো হচ্ছে, আর তার ধোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সুগন্ধটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

একদিন এক বন্ধুকে বলেছিলাম, তোমাদের মন্দিরের আশপাশে গেলে খুব সুন্দর একটা সুগন্ধ পাওয়া যায়, আমার খুব ভালো লাগে। সে বলেছিল, এটা তো ধূপের সুগন্ধ। সেই থেকে নামটা আমার কাছে খুব পরিচিত। সুগন্ধটাও ভুলে যাওয়ার মতো নয়, এতটাই প্রিয় যে আজও কোথাও ধোঁয়া দেখলে মনে মনে আশা করি, এই বুঝি ধূপ জ্বালানো হয়েছে। মাঝে মাঝে আশাটা পূর্ণ হয়, আর মাঝে মাঝে পরে কোনো এক সময়ের জন্য তোলা থাকে।

শুধু মন্দিরে নয়

ধূপ যে শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দিরেই জ্বালানো হয়, এই ভুল ধারণাটা ভেঙেছিল এক আত্মীয়ের বাসায়। তার বাসায় ঢুকতেই হঠাৎ ধূপের সুগন্ধ নাকে এসে লাগল। জিজ্ঞেস করলাম, আপনি ধূপ জ্বালিয়েছেন কেন? তিনি বললেন, ধূপের ধোঁয়া তো অনেক কাজের, এই ধোঁয়ায় মশা চলে যায়। বেশ কিছুক্ষণ বসে ছিলাম সেদিন তার বাসায়, ধূপের ধোঁয়ার নেশায়।

বলধা গার্ডেনে শামীমের ডাক

কিছুদিন আগে সামাজিক মাধ্যমের একটা গ্রুপ উদ্ভিদ চত্বরের পক্ষ থেকে বলধা গার্ডেনে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সুযোগ না বলে সৌভাগ্য বলাই ভালো, কারণ বেশ কিছুদিন ধরেই শহীদুলকে বলধা গার্ডেনে যাওয়ার কথা বলছিলাম। গার্ডেনের দুটি অংশের মধ্যে সাইকি নামের অংশটা সবার জন্য উন্মুক্ত না হলেও উদ্ভিদ চত্বরের বদৌলতে সেখানে ঢুকতে পেরেছিলাম। পরিচিত-অপরিচিত নানা রকম গাছের সমাহার সেখানে। সেই ঘোরাঘুরির গল্প অন্য একদিন করব।

সাইকির একদম শেষ অংশে আমরা সবাই ঘোরাঘুরি করছিলাম, হঠাৎ শামীম ডাক দিল। কাছে গিয়ে দেখি একটা গাছের নিচে বসে বসে কী যেন দেখছে। আমাকে দেখেই জিজ্ঞেস করল, ধূপ দেখেছ? এই দেখো ধূপের গাছ। আমি তো অবাক। ধূপের গাছ মানে কী, তাহলে এই গাছ থেকেই কি সেই ধোঁয়া বানানো হয়? এই গাছের সঙ্গে মন্দিরের ধূপের আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে কি না, আমিও জানি না, শামীমও না।

এসব ভাবতে ভাবতে আবার গাছটার দিকে তাকালাম। লম্বা-চওড়া গাছ, নিচের দিকে কোনো শাখা-প্রশাখা নেই। মনে হচ্ছিল একটা ইলেকট্রিক পোল দাঁড় করিয়ে রাখা আছে, আর সেই পোলের মাথায় অনেক অনেক পাতা। কাণ্ডটা খুব মসৃণ, রংটা একটু মাটির মতো, ধূসর বলা চলে। ওই উঁচুতে যে পাতাগুলো দেখা যাচ্ছিল, সেগুলো অনেকটা গর্জনের পাতার মতো। সেই জন্যই প্রথমে এই ধূপের গাছকে আমি গর্জন বলে ভুল করেছিলাম। গাছটার গায়ে বৈজ্ঞানিক নাম লেখা ছিল Canarium resiniferum Bruce ex King, আর পরিবার Burseraceae। দুটোই লিখে নিয়েছিলাম।

বাসায় ফিরে একটু খোঁজাখুঁজি করে দেখলাম, আমাদের সন্দেহ ঠিকই ছিল। এই গাছের সঙ্গে মন্দিরের ধূপের গভীর সম্পর্ক আছে। গাছের কাণ্ড থেকে এক ধরনের রেজিন চুঁইয়ে বের হয়, সেটাই শুকিয়ে মন্দিরে ধূপ হিসেবে জ্বালানো হয়।

মিরপুরে আবার দেখা

এই ধূপের সঙ্গে আবার দেখা হয়েছিল মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনের ৫৭ নম্বর সেকশনে। সত্যি বলতে সেখানেই ধূপ গাছগুলোর সঙ্গে ভালোভাবে পরিচয় হয়েছিল। অনেকগুলো ধূপের গাছ একদম সারিবদ্ধভাবে লাগানো। ধূপের গায়ে এক ধরনের লম্বা লম্বা দাগ থাকে, সেটা সেখানেই জানতে পারলাম। পাতা একটু শক্ত, ওপরের দিকটা তেলচুকচুকে হলেও নিচের দিকে অনেক রোম থাকায় একটু আলাদা দেখায়।

একটু সমস্যায় পড়েছিলাম নাম নিয়ে। এখানে পরিবার Burseraceae একই থাকলেও বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া Canarium zeylanicum (Retz.) Blume। অথচ বলধা গার্ডেনে দেখা আর এখানে দেখা দুটো গাছই দেখতে প্রায় একই রকম। পরে জেনেছি Canarium zeylanicum আসলে শ্রীলঙ্কার একটা প্রজাতি, Canarium resiniferum থেকে আলাদা। তাই দুই গার্ডেনের দুই নেমপ্লেটের কোনো একটা আরেকবার যাচাই করে দেখা দরকার।

ধূপ গাছের পরিচয়

আমাদের দেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাকৃতিকভাবে ধূপ গাছ জন্মায়, তাই সেখানে এর কিছু স্থানীয় নামও আছে। বারি রাতা, ধনিয়া রাতা বা পাইরাং নামে সেখানে এই গাছ বেশ পরিচিত। শুধু আমাদের দেশেই নয়, পাশের দেশ ভারত, মিয়ানমার আর চীনেও এই গাছ প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়।

গবেষণায় এই গাছের রেজিন আর অলিওরেজিনে limonene, alpha-pinene আর amyrin-এর মতো বেশ কিছু টারপিন যৌগ পাওয়ার কথা জানা গেছে, আর বাকল ও কাঠে phellandrene ছাড়াও sitosterol-এর মতো কিছু স্টেরল পাওয়া গেছে। এই গাছের কাঠও খুব কাজের, এই কাঠ দিয়ে ভিনিয়ার আর প্লাইউড তৈরি হয়। ফল আর বীজ ভালো তেলের একটি উৎস, আর অনেক দেশে ফলগুলো খাবার হিসেবেও খাওয়া হয়।

আমার একটা ধূপের গাছ নিজের বাড়ির পাশে লাগানোর খুব ইচ্ছা আছে। গাছটা বড় হয়ে যদি অনেক অনেক রেজিন দিতেই থাকে, তাহলে সারাদিন সেগুলো শুকাব আর রাতে জ্বালিয়ে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাব।

এখানে লেখা ভেষজ ব্যবহারগুলো শুধু জানার জন্য। কোনো রোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

উপন্যাস অ্যাভাটার

লিখেছেন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।