তখন কেবল নতুন নতুন কলেজে ভর্তি হয়েছি। কীসের একটা ছুটিতে বাসায় গেছি, মনে নেই। সেই সময়ের একটা ঘটনা বলি। ফুফুর বাসায় বসে আছি, হঠাৎ এক বয়স্ক মহিলা এসে ফুফাকে জিজ্ঞেস করলেন, আশেপাশে আকুন্দার গাছ দেখেছিস রে ব্যাটা? ব্যথার জ্বালায় আর পারা যায় না। আকুন্দা প্যালে লিয়া আয় তো। ফুফা জি কাকি বলে কিছুক্ষণ চিন্তা করে বের হয়ে পড়লেন। আমিও যাব বলে ফুফার সঙ্গে বের হলাম।
এদিক ওদিক হাঁটাহাঁটি করে রাস্তার ধারের একটা গাছের ডাল ভেঙে নিয়ে এলেন ফুফা। আমি চাইতেই বললেন, দেখতে দেব, কিন্তু খবরদার পাতা ছিঁড়বে না, চুপচাপ দেখো, দেখে ফেরত দাও। একটা পাতায় হাত দিতেই রেগে গিয়ে বললেন, এমনি এমনি তো বলিনি, এটা বিষাক্ত বলেই নিষেধ করেছি। বিষাক্ত কথাটা শুনে তাড়াতাড়ি সেটা ছেড়ে দিয়ে একসঙ্গে বাসার দিকে ফিরলাম। সেই মহিলা তখনো বসে ছিলেন। ডালটা তাঁর হাতে দিতেই দেখলাম একটা পাতা ছিঁড়ে নিলেন, আর ছেঁড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাদা সাদা কষ বের হতে লাগল। সেই কষই তিনি পায়ে লাগিয়ে দিলেন। আগের রাতে নাকি কিছু একটা কামড়ে দিয়েছিল, জায়গাটা ফুলে লাল হয়ে টনটন করছিল। এটা দিলে নাকি তাড়াতাড়ি সেরে যাবে।
ভার্সিটিতে এসে আসল পরিচয়
ভার্সিটিতে আসার পর আকন্দের সঙ্গে পরিচয় হয়, আর তখন বুঝতে পারি সেদিনের আকুন্দা এই আকন্দই ছিল। অন্য কোনো গাছ চিনতে ভুল হলেও যে একবার আকন্দ দেখেছে তার ভুলে যাওয়ার কথা নয়, ভুল করারও কথা নয়। অন্য গাছের তুলনায় আকন্দের পাতা, আর বিশেষ করে এর ফুল একদমই আলাদা। পাতাগুলো পুরোপুরি সবুজ না, একটু ধূসর সাদাটে ভাব আছে, আর পুরোটা জুড়ে ছোট ছোট রোম। ফুলের পাঁচটা স্টেমেন একসঙ্গে ফিউজ হয়ে মুকুটের মতো দেখায়, আর তাতে হালকা বেগুনি রং এনে দেয় এমন এক রাজকীয়তা যা সচরাচর অন্য কোনো গাছে দেখা যায় না। সেই জন্যই তো একে ইংরেজিতে Crown Flower বলে।
ও, আকন্দের পরিচয়ই তো দিইনি। আকন্দের বৈজ্ঞানিক নাম Calotropis gigantea। আমি এতদিন মিল্কি ল্যাটেক্স আর বিষাক্ত মানেই প্রাথমিকভাবে Euphorbiaceae পরিবার ধরে নিতাম, কিন্তু আকন্দের বেলায় এসে আমার এই কমন হিসাব আর খাটেনি। প্রথমে জেনেছিলাম আকন্দের পরিবার Asclepiadaceae; এই পরিবারের উদ্ভিদে সাধারণত দুধের মতো তরুক্ষীর থাকে বলে এদের আরেকটা কমন নাম মিল্কউইড। আজ এতদিন পরে এসে জানলাম, আকন্দ আসলে Apocynaceae পরিবারের, আর সাবফ্যামিলি Asclepiadoideae।
এই আকন্দের আদি নিবাস ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, চীন, কম্বোডিয়া, নেপাল, শ্রীলঙ্কার মতো উষ্ণ অঞ্চল। তাই তো সচরাচর একে রাস্তার ধারের উঁচু জায়গায়, বাড়ির উঠোনে, যেখানে পানি কম জমে আর আবহাওয়া শুষ্ক, সেসব জায়গায় বেশি দেখা যায়। আমাদের দেশে আকন্দ প্রাকৃতিকভাবেই যেখানে সেখানে জন্মায়, তবু কারো ইচ্ছা হলে শাখা কলম বা বীজ থেকে এর বংশ বাড়াতে পারে। একে ঠিক গাছ বলা উচিত হবে না, এটা একটা গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ, যদিও আজকাল আমরা সব উদ্ভিদকেই গাছ বলে ডাকি। সাধারণত আকন্দ ২ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, জায়গা ভেদে আরো বড়ও হতে পারে।
স্কুলের মাঠের সেই পুরোনো সহযোগী
কিছুদিন আগেও ভাবতাম কেউ আকন্দের গাছ সহজে ভুলতে পারে না, কিন্তু এবার রোজার ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি গিয়ে নিজের কথার ভুল নিজেই প্রমাণ করলাম। প্রতিবারের মতো শিবগঞ্জ সরকারি মডেল হাইস্কুলে আমাদের ব্যাচের ইফতার ছিল। নানা কারণে কোনোবারই এই ইফতারে যেতে পারিনি, কিন্তু এবার আল্লাহতায়ালার রহমতে উপস্থিত ছিলাম। মডেল মাঠে ঢুকেই আকন্দের গাছ দেখে চমকে গেলাম। চমকাব না? পুরো ছয় ছয়টা বছর যার কাঁধে পা দিয়ে স্কুলের প্রাচীর টপকে ক্রিকেটের বল আনতে গেছি, কালুপুর ঘুরতে যাওয়ার শর্টকাট হবে বলে মেনগেট দিয়ে না বেরিয়ে ওদিক দিয়ে বেরিয়েছি, সবার স্কুল পালানোর সহযোগী হিসেবে যার সাহায্য আজও লাগে, সেই গাছটা নাকি আকন্দ। সে এত বিশাল আকার ধারণ করেছে? এই সুন্দর ফুলগুলো কোনোদিন চোখে পড়ল না কী করে? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করি।
চেয়েছিলাম তখনই সেই স্মৃতিজড়ানো গাছটার কিছু ছবি তুলি, কিন্তু পারিনি। ইদানীং সমালোচনার ভয় মনের মধ্যে চেপে বসেছে, ছবি তুলতে গেলে সবাই কী বলবে না বলবে। তাই মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম পরে এক সময় এসে ছবি তুলব। ঈদের পরে একদিন গেলাম মডেল স্কুলের মাঠে। আকন্দের গাছটা দেখেই ভালো লাগছিল, একদম ফুলে ফলে ভরা। বয়সের কারণে এর কান্ড একেবারে বেলগাছের মতো চেহারা নিয়েছে।
আকন্দের ফল দেখার তীব্র ইচ্ছা ছিল ভার্সিটিতে ভর্তির পর থেকেই, কিন্তু সে ইচ্ছা পূরণ হয়নি। কিছুদিন আগেই রাসিফকে বলেছিলাম আকন্দের ফল দেখার খুব ইচ্ছা। এভাবে এখানে যে আমার বহুদিনের সেই ইচ্ছা পূরণ হবে, ভাবতেই অবাক লাগে। ফলটা দেখতে একদম একটা নৌকার মতো, বা অর্ধেক চাঁদের মতো। ভেতরে বাদামি বীজগুলো খুব সুন্দর একটা প্যাটার্নে থাকে, একটার উপর আরেকটা সারিবদ্ধভাবে সাজানো। বীজের প্রান্তে থাকে তুলার মতো লম্বা লম্বা রেশম, দেখতে কিছুটা কাশবনে উড়ে যাওয়া কাশের মতো। ভারতীয় উপমহাদেশে বীজের এই তুলা বালিশ ভরতে শিমুল তুলার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
সঙ্গে আমার ভাই জামান ছিল, তাই তাকে বললাম একটা ফল পেড়ে ছোট্ট একটা ভিডিও বানিয়ে নিই। ভিডিও বানালাম ঠিকই, কিন্তু অপরিণত ফল দিয়ে, বুঝতেই পারছিলাম না কোনটা পাকা আর কোনটা কাঁচা। আকন্দের কষ বিষাক্ত বলে তাকে বারবার সতর্ক করছিলাম, বলা যায় না, একটা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে বসলে শখ দুর্দশায় পরিণত হবে। কখন যে অনেকগুলো ছেলেমেয়ে আমাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে গেছে খেয়ালই করিনি। যখন বুঝলাম, আর কী করার, চুপচাপ উল্টো দিকে হাঁটা ধরে মাঠ থেকে বেরিয়ে এলাম।
শ্বেত আকন্দের খোঁজে
আকন্দের ফল দেখার ইচ্ছা পূরণ হয়েছে ভেবে খুব আনন্দ লাগলেও মনের এক কোণে শ্বেত আকন্দ নামের আরেকটা ছোট্ট ইচ্ছা বারবার উঁকি দিচ্ছিল। শুনেছিলাম শ্বেত আকন্দও আছে, এমনকি দেখাও পেয়েছিলাম, তবে কাছ থেকে নয়, বাসে বসে। আমাদের শিক্ষাসফরে গিয়েছিলাম সিলেট। যাওয়ার পথে বেশ কিছু জায়গায় মনে হয়েছিল রাস্তার ধারে শ্বেত আকন্দ ফুটে আছে। এটা আমার ভ্রান্ত ধারণা কি না বোঝার জন্য শহিদুলকে জিজ্ঞেস করলাম, সেও শ্বেত আকন্দ দেখতে পাচ্ছে কি না। প্রথমে সে কিছু না বললেও পরে আমার সঙ্গে একমত হলো। তখন যে কী অবস্থা, বলে বোঝানোর মতো না। শুধু মনে হচ্ছিল বাস থেকে নেমে পড়ি আর কিছু ছবি তুলে নিই। একবার তো মনে হলো স্যারদের বলি বাসটা থামাতে, শ্বেত আকন্দের ছবি তুলব বলে, কিন্তু এটা কি আর বলা যায়। তবু মন মানে না, শামীমকে জিজ্ঞেসও করলাম, স্যারদের কি বাস থামানোর কথা বলা যায়? সে আমাকে এরকম কাজ না করাই ভালো বলে দিয়ে শ্বেত আকন্দকে কাছ থেকে দেখার ইচ্ছাটা ইচ্ছাই বানিয়ে রেখে দিল।
সেই ইচ্ছাটাও এবারই পূরণ হয়েছে। একা একা গিয়েছিলাম মামার বাড়ি, একটা কাজে। প্ল্যান ছিল যাব, দেখা করব, কাজ শেষ করে চলে আসব। প্ল্যানমতোই সব সেরে বাড়ির দিকে ফিরছি, অটোর সামনের সিটে বসে রাস্তার আশপাশ উপভোগ করছি আর মনে মনে কত কিছু ভাবছি। হঠাৎ মনে হলো রাস্তার ধারে ওটা আকন্দ না, শ্বেত আকন্দ। কিন্তু বিকেলের রোদ গাছটার উপর পড়ছিল বলে ভুলও হতে পারে। একটা ঝুঁকি নিয়েই অটো থেকে নেমে পড়লাম। ততক্ষণে বেশ কিছুটা এগিয়ে এসেছি, সেটুকু হেঁটে ফিরতে হবে। হাঁটছি আর ভাবছি, যা ভাবছি তা না হলে নেমে পড়াই বৃথা। কিন্তু না, বৃথা হয়নি, সেটা শ্বেত আকন্দই ছিল।
রাস্তায় চলতে ফিরতে আকন্দ দেখলেই সেটা শ্বেত আকন্দ কি না, এই চিন্তা থেকে সেদিন মুক্তি পেলাম। ভালোভাবে দেখলাম গাছটাকে। সাধারণ আকন্দের সঙ্গে পার্থক্য শুধু ফুলের রঙে, আকন্দের ফুল হালকা বেগুনি নীল, আর এই শ্বেত আকন্দ পুরোই সাদা। এর বাইরে বাহ্যিক কোনো পার্থক্য চোখে পড়ল না। ইস, আমার যদি দিব্যদৃষ্টি থাকত, তাহলে হয়তো ভেতরে কোনো পার্থক্য আছে কি না সেটাও ওখানে দাঁড়িয়েই বুঝে ফেলতাম। কল্পনা তো কল্পনাই, তবে একসঙ্গে আকন্দের ফল আর শ্বেত আকন্দ দুটোরই দেখা পেয়ে গেলাম, খুব ভালো লাগছে।
আকন্দের ভেতরের রসায়ন আর গ্রামের ব্যবহার
এখানেই শেষ না। বাসায় এসে খোঁজ শুরু হলো আকন্দের ভেতরে কী ধরনের যৌগ আছে। পাতা, কান্ড আর শিকড়ে calotropin, calotoxin, calactin আর uscharin এর মতো বেশ কিছু কার্ডিয়াক গ্লাইকোসাইড, lupeol, amyrin, taraxerol আর sitosterol জাতীয় ট্রাইটারপিনয়েড, আর gigantin নামের একটা বিষাক্ত যৌগ পাওয়া গেছে। শিকড়ের ছালে giganticine নামের একটা বিশেষ অ্যামিনো অ্যাসিড আছে, যেটা পোকামাকড়ের কাছে এই গাছকে খাবারের অনুপযোগী করে তোলে। এই যৌগগুলোর অনেকগুলোই বিষাক্ত, আর সেই জন্যই আকন্দের কষ নিয়ে এত সাবধানতা।
তবু গ্রামে আকন্দের পাতা, কষ আর শিকড় ঐতিহ্যগতভাবে নানা কাজে লাগানো হয়। পোকার হুলের জ্বালায়, দাদ, খোস আর একজিমার মতো চর্মরোগে, পুরোনো ঘায়ে, বুকে সর্দি বসলে, আর পাতলা পায়খানার সঙ্গে পেট ব্যথায় এর ব্যবহারের কথা পুরোনো ভেষজ বইগুলোতে পাওয়া যায়। সেই বয়স্ক মহিলা যে কষটুকু পায়ে লাগিয়েছিলেন, সেটাও এই ধারারই ব্যবহার। একটা কথা মনে রাখা দরকার, আকন্দের কষ চোখে গেলে বা পেটে গেলে ক্ষতি করতে পারে, তাই গাছটা নাড়াচাড়া করার সময় সাবধান থাকা ভালো।
শেষে একটা কথা বলি। মানুষের চাওয়া কখনো শেষ হয় না। একটা চাইলাম, পেয়ে গেলাম, তারপর আরেকটা চাই, সেটাও পেলে অন্য একটা, তারপর আরেকটা, এভাবে চলতেই থাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। আমার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম না। আকন্দের আরেকটা প্রজাতি Calotropis procera দেখার নতুন একটা ইচ্ছা জেগেছে। যদিও জানি এই প্রজাতি আমাদের দেশে দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, তবু ইচ্ছাটা থাকল। ইনশাআল্লাহ এক না একদিন দেখা পাব, এই আশা নিয়েই পথ চলা। হয়তো আবারও রাস্তার ধারে কোনো আকন্দ চোখে পড়লে চেয়ে থাকব বোঝার চেষ্টায়, সেটা Calotropis gigantea, নাকি Calotropis procera।
এখানে লেখা ভেষজ ব্যবহারগুলো শুধু জানার জন্য। কোনো রোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

মন্তব্য করুন