মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনের ভেষজ বাগানে প্রথম এই ফুলটা দেখেছিলাম। আমি, শামীম, মেহেরান আর জামান হাঁটাহাঁটি করছিলাম, হঠাৎ আমার চোখে পড়ল। বাগানের বাইরের দেয়ালের অনেক ভেতরে ছিল, তাই শামীমকে বললাম, ভাই, এই ফুলটার একটা ছবি তোলো তো, দেখেই মেডিসিনাল মনে হচ্ছে। সেদিন ভালোভাবে তার দেখা পাইনি।
কিছুদিন পর মোকাররম ভবনের পাশ দিয়ে হেঁটে আসার সময় দেখলাম ফার্মেসি গার্ডেনের ভেতরে সেই একই ফুল। এখানেও অনেক ভেতরে বলে এবারও গাছটাকে ভালোভাবে দেখার সুযোগ হলো না। তবে একটা প্ল্যান ছিল, কোনো এক সময় আসব, এসে গাছটাকে ভালোভাবে দেখে যাব।
বাঁশ ভেবে যাকে এড়িয়ে গেছি
বেশ কিছুদিন আর দেখা হয়নি সেই চোখধাঁধানো ফুলগুলোর সঙ্গে। কিন্তু তার সঙ্গে এমন এক জায়গায় দেখা হলো যে অনেকটাই অবাক হয়েছিলাম। আমাদের ডিপার্টমেন্টের মেডিসিনাল গার্ডেনে যেতেই তার সঙ্গে দেখা। এতদিন যেগুলোকে বাঁশের বনসাই বা বাঁশের অন্য কোনো জাত ভেবে এসেছি, সেখানে এই ফুল। অনেকক্ষণ বোঝার চেষ্টা করলাম এটা আলাদা কোনো গাছ, নাকি সত্যিই তারই ফুল।
এতদিনে একে কাছ থেকে দেখতে পেলাম। বিরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ, একটা কান্ড মাটির নিচ থেকে উঠে এসেছে, কোনো শাখাপ্রশাখা নেই, আর পাতাগুলো একটার উপর আরেকটা ওভারল্যাপ করে সেই কান্ডকে জড়িয়ে ধরে আছে। পাতার রং একটু গাঢ় সবুজ, আকারে ল্যানসিওলেট। কান্ডের ডগায় লম্বা হয়ে বেশ কিছু ফুল গুচ্ছ বেঁধে ধরে আছে, সাদার মাঝে লালের মিশ্রণ। ফুলগুলোর কী সুন্দর রূপ, একটামাত্র পাপড়ির মতো একটা ল্যাবেলাম আর তার সামনে ঝুলন্ত একটা অ্যান্থার। পুষ্পবিন্যাস রেসিম ধরনের। ছবি তুললাম। ক্যাম্পাসে পেয়েছি বলে নিশ্চিত ছিলাম, এর পরিচয় পেতে বেশি কষ্ট করা লাগবে না।
নাম পেয়ে যে ভুলটা করেছিলাম
বাস্তবেও বেশি সময় লাগেনি, কিন্তু পরিচয় জেনে একটু অবাক হলাম। প্রথমে যে নামটা পেলাম সেটা হলো ছোট এলাচ। মানে আমরা রান্নায় যে এলাচ ব্যবহার করি, এটা নাকি তারই ফুল। শুনে মনে হয়েছিল, সেই জন্যই তো মাঝে মাঝে মনে হয় সবার একটা ছোটখাটো বাগান রাখা দরকার। রাখলে সেখান থেকে শাকসবজি পাবে, ফলমূল পাবে, নানা ধরনের মসলা পাবে, আর সঙ্গে পাবে মানসিক শান্তি, সৌন্দর্য আর আত্মতৃপ্তি।
কিন্তু একটু ঘাঁটতেই বুঝলাম, নামে মিল থাকলেও এটা ঠিক আমাদের রান্নাঘরের এলাচ নয়। এই গাছটার বৈজ্ঞানিক নাম Alpinia calcarata, আর রান্নায় আমরা যে ছোট এলাচ ব্যবহার করি সেটা আসে Elettaria cardamomum থেকে। দুটোই আদা পরিবার বা Zingiberaceae পরিবারের সদস্য, মানে সম্পর্কে কাছাকাছি আত্মীয়, কিন্তু এক গাছ নয়। এর ফুল অনেকটা স্ন্যাপড্রাগনের মতো বলে একে স্ন্যাপ জিনজার বলে। ভারতের নেটিভ, তাই এর আরেকটা নাম ইন্ডিয়ান জিনজার। কার্ডামম জিনজার কেন একে ডাকে, সেই ব্যাখ্যা না হয় অন্য কোনো দিন বলব।
আদার মতো এরও মাটির নিচে কন্দ বা রাইজোম হয়, সেখান থেকেই এর উৎপত্তি। এটি একটি পেরিনিয়াল হার্ব বা বিরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ, যা কয়েক বছর বাঁচে। ৪৮টা ক্রোমোজোমের এই উদ্ভিদের কন্দ আদার মতোই ব্যবহার করা যায়। নিজের বাগানে হলে হয়তো মাটির নিচ থেকে কন্দ বের করে দেখতাম, ছবিও তুলতাম। কিন্তু নিজের তো না, কেউ দেখে ফেললে তো শেষ, এই চিন্তায় এই কন্দ স্বচক্ষে দেখার সুযোগ এ পর্যন্ত হয়নি। জানি না হবেও কি না।
কন্দের ভেতরে যা আছে
এর কন্দ, ফুল আর মূলে বেশ কিছু উদ্বায়ী তেল পাওয়া যায়, যার মধ্যে 1,8-cineole, camphene, pinene, camphor, borneol আর methyl cinnamate প্রধান। এর বাইরে quercetin আর vanillic acid এর মতো কিছু যৌগ আর কিছু টারপিনও এতে আছে বলে গবেষণায় জানা গেছে।
এই গাছের সবচেয়ে বেশি ভেষজ ব্যবহার হয় এর কন্দ বা রাইজোমের। ঐতিহ্যগতভাবে গলা ব্যথা, গলার স্বর ভেঙে গেলে, কাশি, হাঁপানি, বাতের ব্যথা, জ্বর আর হজমের গোলমালে এর কন্দ ব্যবহার করা হয়। আমাদের দেশে না হলেও ভারতে এর কচি কান্ড রান্না করে খাওয়া হয়।
তবে একটা কথা ঠিক করে ফেলেছি। এরপর থেকে যদি কোনোদিন খেতে খেতে এলাচ দাঁতের নিচে চাপা পড়ে, তাহলে অন্তত আমি একে বিরক্তির চোখে না দেখে ডিপার্টমেন্টের বাগানের এর রূপসী আত্মীয়টার কথা মনে করে সসম্মানে ফেলে দেব।
এখানে লেখা ভেষজ ব্যবহারগুলো শুধু জানার জন্য। কোনো রোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

মন্তব্য করুন