অপ্রত্যাশিত জায়গায় ফক্সটেলের দেখা

উপন্যাস অ্যাভাটার
পড়তে ৫ মিনিট
এই লেখায়

একটু কাজে ফ্যামিলির সঙ্গে গিয়েছিলাম কানসাটের ওপারে। কানসাট হাইস্কুল পার হয়ে আরেকটু যেতেই হঠাৎ একটা বাগানের ভেতরে আমগাছে কিছু ফুল চোখে পড়ল। দেখতে খুব সুন্দর। পাতাগুলো লম্বা লম্বা চিরল পাতা, আর ফুলটাকে একটা ফুল মনে হলো না, অনেকগুলো ফুল একটা দণ্ডে গুচ্ছ হয়ে নিচের দিকে ঝুলে আছে।

দেখে ফক্সটেলের মতো লাগল, কিন্তু অত গুরুত্ব দিইনি। ছবিতে দেখলেও সচক্ষে এ পর্যন্ত ফক্সটেল দেখিনি, আর ফক্সটেলের মতো দামি অর্কিড গ্রামের সাধারণ একটা বাগানে কোথা থেকে আসবে। অনেকগুলো গাছে দেখতে পেলে কিংবা বাগানের আশপাশে বাড়ি থাকলে বলতাম কেউ লাগিয়েছে।

কিছুদূর গিয়ে মনে হলো আরেকটা গাছেও ফক্সটেলের মতো ফুল চোখে পড়ল। এবার আর বিষয়টা অবহেলা করা যাবে না, ভালোভাবে দেখতে হবে সত্যিই সবগুলো ফুল ফক্সটেল, নাকি আমার বারবার ভুল হচ্ছে। একদম নজর তীক্ষ্ণ করে বাগানগুলোর দিকে তাকিয়ে গন্তব্যের দিকে যাচ্ছি, কিন্তু আর কিছুই চোখে পড়ল না। কাজ শেষে ফেরার সময় একই রাস্তা দিয়ে এলাম। এবার আমি পুরোপুরি সতর্ক, আমার ধারণা ঠিক কি না নিশ্চিত হতেই হবে। সত্যিই তো, এ তো ফক্সটেল।

ছবি তোলা দরকার। একা থাকলে নেমে পড়তাম, কিন্তু আম্মা আছেন, আপু আছে, এখন তো নেমে পড়া যায় না। ঠিক করলাম পরে অন্য কোনো এক সময় এসে ছবি তুলে যেতে হবে। ফুলগুলো আবার সামনে আসতেই অটো থেকে সবাইকে সেদিকে তাকাতে বললাম। ফুলগুলো দেখে আম্মা যা বললেন, শুনে একটু অবাক হলাম। এই ফুল নাকি আগে আমাদের বাড়ির আশপাশের গাছে অনেক হতো, এখন আর দেখা যায় না।

ঈদের চতুর্থ দিনে আবার কানসাটে

পরের দিনই ছবি তুলতে যাব বলে ঠিক করলাম, কিন্তু কাজে কাজে আর যাওয়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। ঈদের চতুর্থ দিন আমি, মারযুক, জামান, শামীম ভাইয়া আর মোমিন ভাইয়া মোটরসাইকেলে ঘুরতে বের হলাম। শামীম ভাইয়ার সঙ্গে আমি আর মারযুক, আর আবদুল মোমিন ভাইয়ার সঙ্গে জামান।

কানসাট হয়ে যাচ্ছিলাম বলে ছবি তোলার কথা মনে পড়ল। ভাইয়াকে বললাম গাড়িটা একটু থামাতে, ছবি তুলতে হবে। আমার সঙ্গে মারযুকও গেল, কার ছবি তুলছি সেটা দেখতে। সেখানে গিয়ে কাছ থেকে ফক্সটেলকে দেখার সুযোগ হলো।

গাছের গায়ে ওর মূলের রাজত্ব, একদম চারদিকে ছড়িয়ে আছে। দেখে মনে হলো বুড়ো মানুষের হাতে যেমন রগগুলো ফুটে ওঠে, ঠিক সেরকম। আর এর পাতাগুলোর প্রশংসা না করলেই নয়। হালকা সবুজ রঙের, লম্বায় প্রায় আধ হাত, নিচের দিকে যেতে যেতে হঠাৎ সরু হয়ে গেছে, আর পাতার মাঝ বরাবর সুস্পষ্ট একটা খাঁজ। দেখে মনে হয় একদম একটা বাঁটবিহীন তলোয়ার।

আর ফুল তো নয়, যেন ফুলের মালা ধরে আছে। কেউ যেন একশটারও বেশি ফুল একটা একটা করে সারি বেঁধে গেঁথে গাছের কাণ্ডে রেখে চলে গেছে। একটা মালা নয়, চারপাশে একসঙ্গে ঝুলে আছে আট আটটা মালা।

রংটাও নজরকাড়া, গোলাপি, আর গোলাপির সঙ্গে হালকা নীলের আভা। গোড়ার দিকে পুরোনো আর ক্রমে প্রান্তের দিকে নতুন ফুল সাজানো, মানে পুষ্পবিন্যাস রেসিম ধরনের। হালকা মিষ্টি একটা ঘ্রাণও টের পেলাম। দেখেই কিছু বাড়ি নিয়ে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছা হচ্ছিল। কিন্তু আমি নিয়ে চলে গেলে বাকিরা দেখবে কী, এই চিন্তায় আর নেওয়া হলো না।

পরগাছা নয়, পরাশ্রয়ী

ঘোরাঘুরি শেষে বাড়ি ফিরে ছবিগুলো শামীম ভাইয়াকে দেখাতেই ভাইয়া প্রায় আম্মার কথাটাই বললেন। এই ফুলের ছবি তুলতে গিয়েছিলে, এগুলো তো পরগাছা। ছোটবেলায় এগুলো নিয়ে কত খেলেছি, আশপাশের বাগানে, বিশেষ করে তোমাদের বাড়ির পেছনের বাগানটার প্রায় প্রতিটা আমগাছে এই ফুল ধরে থাকত, দেখতে খুব ভালো লাগত, কিন্তু এখন আর পাওয়া যায় না। একবার মনে হলো বলি, ফক্সটেল পরগাছা নয়, পরাশ্রয়ী উদ্ভিদ বা এপিফাইট। কিন্তু বলার সুযোগ হয়নি। পরগাছা আর পরাশ্রয়ী দুটোই অন্য কোনো গাছে বা হোস্টে জন্মায়, কিন্তু পরগাছা হোস্টের ক্ষতি করে, আর পরাশ্রয়ী কোনো ক্ষতি করে না।

ভেবে দেখলাম, বাড়ির পেছনের বাগানে তো মাঝে মাঝেই যেতাম, ক্রিকেট খেলতে কিংবা আম কুড়াতে, কিন্তু কোনোদিন এই ফুল দেখেছি বলে মনে পড়ে না। ভাইয়ার কথা শুনে একটু দুঃখই হলো। আজকাল সেই আগের পরিবেশ আর কোথায়, গাছপালা কেটে সবাই বাড়িঘর বানিয়ে নিচ্ছে, চারদিক ধুলাবালিতে ভরে যাচ্ছে। সত্যিই তো, মানুষ পরিবেশের যা অবস্থা করেছে, তাতে মানুষ নিজেই থাকতে কষ্ট পাচ্ছে, আর এই ধরনের সেনসিটিভ গাছপালা আর পোকামাকড় কীভাবে বাঁচবে।

ফক্সটেলের আসল পরিচয়

বাসায় এসে শুরু হলো ফক্সটেলের তথ্য জোগাড় করা। আসলে এই ফুলের বাংলায় কোনো নাম নেই বলে ইংরেজি নাম fox tail থেকেই বাংলায় ফক্সটেল চলে এসেছে, আর এক কথায় অর্কিড। কিছুটা শিয়ালের লেজের মতো দেখতে বলেই এই নাম। বৈজ্ঞানিক নাম Rhynchostylis retusa, Orchidaceae পরিবারের একজন সদস্য। এরা সাধারণত আর্দ্র আর ছায়াযুক্ত জায়গায় বড় কোনো গাছের কাণ্ডে ভালো জন্মায়, তবে হোস্ট স্পেসিফিক নয়, মানে যেকোনো গাছের কাণ্ডেই হতে পারে। সূর্যের সরাসরি আলো এদের জন্য ক্ষতিকর।

আমাদের দেশসহ ভারত, নেপাল, মায়ানমার আর চীনে এদের প্রাকৃতিকভাবে দেখা যায়। আমাদের দেশে সর্বত্র পাওয়া গেলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম বা পাহাড়ি এলাকায় এদের সংখ্যা বেশি। সাধারণত মে মাস থেকে জুন-জুলাই পর্যন্ত ফুল হয়। ফুলে মধু থাকে বলে নানা কীটপতঙ্গ, পাখি আর মৌমাছির আনাগোনা লেগে থাকে এর আশপাশে, বিশেষ করে কার্পেন্টার মৌমাছি ফক্সটেলের পরাগায়নকারী হিসেবে বেশি পরিচিত।

অন্য উদ্ভিদের তুলনায় ফক্সটেলের বৃদ্ধি খুবই ধীর। বীজ থেকে নতুন চারা দেখা একরকম সৌভাগ্যের ব্যাপার, কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চারা হওয়ার আগেই বীজ মারা যায়। তবে কৃত্রিমভাবে বংশবৃদ্ধি করা যায়। গোড়া থেকে গজানো কচি চারার নিজের কিছু শিকড় হলে সেটা আলাদা করে অন্য জায়গায় লাগালে সেখানে নতুন গাছ হয়।

আসামের কপৌ ফুল

এই ফক্সটেল ভারতের আসামে প্রচুর পাওয়া যায়, আর সেখানে অনেকেই বাড়ির সৌন্দর্য বাড়াতে লাগান। তবে আসল কথা শুধু সৌন্দর্য নয়, সেখানে এর একটা বিশেষ ভূমিকা আছে। অসমিয়া ভাষায় এর নাম কপৌ ফুল, আর এটি আসামের রাজ্য ফুল। নতুন বছরের আগমনে, বহাগ বিহুর সময়, আসামের মেয়েরা এই ফুল খোঁপায় পরেন। সেখানে ফক্সটেল ভালোবাসার প্রতীক।

ফক্সটেলের কিছু ভেষজ ব্যবহারও প্রচলিত আছে। লোকজ চিকিৎসায় টাটকা ফক্সটেল কোমলকারক হিসেবে আর বাতের ব্যথায় ব্যবহার করা হয়। মালাবার অঞ্চলে এই উদ্ভিদ থেকে তৈরি ভেষজ হাঁপানি, মাংসপেশিতে টান, মাথা ঝিমঝিম করা আর বুক ধড়ফড়ের মতো সমস্যায় প্রচলিতভাবে ব্যবহার করা হয়।

হারিয়ে যাওয়ার আগে

এত গুণের ফক্সটেল পরিবেশ দূষণ আর অসাধু ব্যবসায়ীদের শিকার হয়ে আজ হুমকির মুখে। শিগগিরই কোনো ব্যবস্থা না নিলে হয়তো আর বেশি দিন লাগবে না ফক্সটেলের আমাদের মাঝ থেকে বিলীন হয়ে যেতে। হ্যাঁ, মানছি যে বাসায় লাগালে এর একটু বেশি যত্ন করতে হয়, সময়মতো আর পরিমাণমতো পানি দিতে হয়, সার দিতে হয়, না হলে মারা যায়। কিন্তু এত সুন্দর একটা উদ্ভিদের জন্য এটুকু কষ্ট খুব একটা বেশি না, এটুকু তো করা যেতেই পারে।

এখানে লেখা ভেষজ ব্যবহারগুলো শুধু জানার জন্য। কোনো রোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

উপন্যাস অ্যাভাটার

লিখেছেন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।