আজ ঘুম থেকে জেগেই দেখি অনেকটা দেরি করে ফেলেছি। ক্লাসে সঠিক সময়ে হয়তো পৌঁছাতে পারব না। একবার মনে হলো, থাক, আজ আর ক্যাম্পাসের দিকে যাবই না। একদিন একটু ছুটি নিই, অনেক দিন শান্তিমতো বাসায় বসে থাকা হয় না। তারপর আবার মনে হলো, থাক, ক্যাম্পাসের দিকেই যাই, রাস্তা একটু ফাঁকা থাকলে হয়তো ক্লাসে সময়মতো পৌঁছেও যেতে পারি। এই ভেবে ঝটপট সবকিছু সেরে বেরোলাম। সকালে হয়তো বৃষ্টি হয়েছিল। রাস্তার অবস্থা ভালো না, কাদায় মাখামাখি। সেই রাস্তা পার হয়ে এলাম প্রধান সড়কে। প্রধান সড়কের এমন রূপ অনেক দিন পর দেখলাম, পুরো রাস্তাজুড়ে মানুষ আর মানুষ।
সবাই বাসের অপেক্ষায়, কিন্তু যে বাসই আসছে, সবগুলো মানুষে কানায় কানায় পূর্ণ। বহুদিন ধরে সকাল সকাল রওনা দিই বলে এমন দৃশ্য দেখিনি। আজ পুরোনো দিনের সব স্মৃতি মনে পড়ে গেল। শেষ ভার্সিটি বাসটা আরেকটু আগেই চলে গেছে, তাই অপেক্ষারত মানুষের মধ্যে আমিও একজন। একের পর এক বাস যায়, কিন্তু ওঠার সুযোগ নেই। মিনিটে মিনিটে বাস যায়, এমনকি পাশাপাশি বাসও যায়, তবু কোনো ফাঁকা জায়গা নেই। ঢাকা শহরে মানুষের পরিমাণ কত, এই বাসের জন্য দাঁড়ালে কিছুটা অনুমান করা যায়।
যাই হোক, অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর বুঝলাম, এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে আর হবে না। দুপুর পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকলেও যেতে পারব কি না সন্দেহ। তাই হেলপারের মানা সত্ত্বেও একটার দরজা ধরে উঠে পড়লাম। লাভ হলো না। দাঁড়ানোর জায়গা নেই দেখে বাধ্য হয়ে নেমে যেতে হলো। পরেরটায় ওঠারই জায়গা নেই। কয়েকবার চেষ্টার পর দেখলাম একটা বাস থেকে কয়েকজন নামছে। এই সুযোগ! এবার উঠতে না পারলে আর হবে বলে মনে হয় না। সবাই এই বাসের জন্যই দৌড় শুরু করল। আমি সামনে ছিলাম বলে কোনো রকমে উঠলাম। আমার সঙ্গে আরও কয়েকজন উঠল ঠিকই, কিন্তু মহিলারা সবাই দাঁড়িয়েই থেকে গেলেন। জানি না তাঁদের আর কতক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
সিটিং সার্ভিস
ঢাকা শহরের বাসগুলো নামে সিটিং সার্ভিস, কাজে লোকালের চেয়েও খারাপ। বাস মানুষে কানায় কানায় পূর্ণ, মাঝে দুই সারিতে গাদাগাদি করে দাঁড়ানো, তারপরেও একজন নামলে দুজন ওঠায়। এক বাস অন্য বাসকে সামনে যেতে দেবে না বলে এলোমেলোভাবে চালায়, এমনকি ধাক্কাধাক্কিও করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সবাই উপায় না পেয়ে সবকিছু মেনে নিয়ে দাঁড়ানোর জায়গা পেলেই উঠে পড়ে, কারণ তাকেও যেতে হবে। আর এই সুযোগটাই হেলপার-ড্রাইভাররা কাজে লাগায়। তার ওপর আবার যানজট। বাস থেমে আছে তো আছেই, সামনে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। একটু এগোয় কি না এগোয়, আবার জ্যামে আটকায়। বাসের ফ্যান কোনোটা ঘোরে, কোনোটা ঘোরে না। টাকা খরচ করে ঠিকও করায় না, কারণ তারাও জানে, যাদের যেতে হবে তারা যাবেই, ঠিক করালেও যাবে, না করালেও যাবে। সব মিলিয়ে ঢাকা শহরের যাতায়াতব্যবস্থার অবস্থা খুবই করুণ।
এই সমস্যার সমাধান হবে কি না জানি না। এই শহরের সব বাস ডাবল ডেকার হলে হয়তো সমস্যার কিছুটা নিরসন হতে পারে। আরেকটা আশার আলো মেট্রোরেল। আশা রাখি মেট্রোরেল চালু হলে কিছুটা সুবিধা হবে। নইলে ঢাকা শহরে যাতায়াত এক দুর্যোগের নাম হয়েই থেকে যাবে।

মন্তব্য করুন