বেশ কিছুদিন আগের ঘটনা। বৃক্ষমেলায় ঘোরার পর মোমিনুরের সঙ্গে গিয়েছিলাম তার বোনের বাসায়, মিরপুর-১৩-তে। সেদিকে যাতায়াত কম হওয়ায় ফেরার সময় পড়লাম বিড়ম্বনায়। একটা লোকাল বাসে এলাম কাকলী, বনানীতে। এখান থেকে সরাসরি বাস যায় কি না মনে পড়ে না, তবে মহাখালী থেকে লিংক রোডে যাওয়ার বাস পাওয়া যাবে, এটা নিশ্চিত। গুগল ম্যাপে দেখলাম মহাখালী কতদূরে। বেশি পথ না, তাই ভাবলাম এখান থেকে হেঁটে মহাখালী পর্যন্ত যাই, তারপর দেখা যাবে। কথামতো কাজ, হাঁটা শুরু করলাম, তবে কিছুটা পথ যেতেই তীব্র রোদে অবস্থা খারাপ। নাহ, হেঁটে যাওয়া খুবই কষ্টকর হয়ে উঠল। পরক্ষণেই মনে হলো, কিছু বাস তো ‘মহাখালী, মহাখালী’ বলে ডাক দেয়। সেগুলো একটাতে উঠলেই তো হয়। হয়তো সব ফার্মগেট, তেজগাঁও যাবে, কিন্তু আমি মহাখালীতে নামতে পারলেই হলো।
উল্টো পথে
এই ভেবে একটা মোড়ে দাঁড়ালাম যেকোনো বাস ধরব বলে। একটা বাসকে মহাখালী বলে উঠতেই যাব, ঠিক সেই সময় কন্ডাক্টর বলল, ভাই, রাস্তার ওই পার থেকে ওঠেন। তার কথা শুনে কিছুটা হতভম্ব হলাম। দ্রুত ম্যাপ বের করে দেখলাম, সত্যিই, বাস থেকে নেমে এতক্ষণ উল্টো পথে হাঁটছিলাম! মহাখালী বিপরীত দিকে। ম্যাপ ঠিকই রাস্তা দেখিয়েছিল, কিন্তু আমি উল্টো দিকে আছি সেটা খেয়ালই করিনি। কাকলী থেকে মহাখালীর রাস্তা সোজা চলে যায় বলে ম্যাপও আর খুলে দেখিনি। সেই জন্যই যেকোনো কাজ করার আগে ভালোমতো সবকিছু একবার নিশ্চিত হয়ে নিতে হয়।
যে বাসটা ছেড়ে দিলাম
যাই হোক, রাস্তার বিপরীতে গিয়ে আবার দাঁড়ালাম বাসের অপেক্ষায়। প্রথমেই সামনে একটা বিআরটিসি এসে দাঁড়াল। সেটা মহাখালী হয়ে ফার্মগেট যাবে, উঠে পড়লাম। সামনে সিগন্যাল, তাই বাসে বসে আছি। একের পর এক মানুষ উঠছে। অর্ধেক-খালি বাস একদম ভর্তি হয়ে গেল, তবু সিগন্যাল ছাড়েনি। হঠাৎ বিআরটিসি বাসের পেছনে রবরব বাসটা চোখে পড়ল। তৎক্ষণাৎ মনে হলো, আরে, এই বাসটাও তো লিংক রোডের দিকে যেতে-আসতে দেখেছি! তাহলে এই বাস থেকে নেমে সেটাতে উঠলেই হয়। মহাখালীতে গিয়ে আবার বাস ধরা লাগবে না, সরাসরি লিংক রোডে চলে যেতে পারব। কিন্তু আবার মনে হলো, থাক না, এতে তো উঠেই পড়েছি, আরামে ফ্যানের নিচে বসেও আছি। সেই বাসে যদি সিট না থাকে? তার চেয়েও বড় কথা, এই বাস থেকে নামলাম আর সিগন্যাল ছেড়ে দিল, তখন ওই বাসেও উঠতে পারব না, এই বাসও চলে যাবে। বেশি লোভ করতে গিয়ে আমও যাবে, ছালাও যাবে। এর চেয়ে আরামে বসে আছি, থাকি। মহাখালীতে গিয়ে দেখছি কী করা যায়।
এই ভেবে বসেই থাকলাম বিআরটিসিতে। অল্প রাস্তা হলেও জ্যামের কারণে ধীরে-সুস্থে পৌঁছালাম মহাখালীতে। নেমে বাসে উঠতে যাব, দেখলাম প্রথমেই দাঁড়িয়ে আছে সেই আগের দেখা রবরব বাসটা। কিছুটা নিশ্চিত, এটাই সেটা। সামনের গ্লাসে একটা ভাঙা আঁকাবাঁকা দাগ ছিল। কিন্তু আমি বাস পর্যন্ত যেতে যেতে মহাখালীতে দাঁড়ানো অনেক যাত্রী সেই বাসে উঠে গেল। শেষে দৌড়ে উঠে দেখলাম, ভেতরে আর ফাঁকা জায়গা নেই, মানুষ কানায় কানায় পূর্ণ। পেছনে ঘুরে দেখলাম অন্য বাসেরও একই অবস্থা, ভর্তি ভর্তি বাস আসছে। তাই সেই বাস থেকে আর নামলাম না, একদম লিংক রোড পর্যন্ত এসে তারপর নামলাম।
No risk, no gain
এই ছোট্ট সফর থেকে অনেক কিছু বুঝলাম। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, “No risk, no gain”, মানে ঝুঁকি ছাড়া প্রাপ্তি নেই।
বাস্তবে তা-ই হলো। যদি একটু ঝুঁকি নিয়ে কাকলীতেই বিআরটিসি ছেড়ে রবরব ধরতে নেমে পড়তাম, তাহলে মহাখালীতে এসে এত কষ্ট করতে হতো না, কিছু টাকাও বাঁচত। সামান্য ঝুঁকি এড়াতে গিয়ে শেষে ওই বাসেই উঠলাম, কিন্তু বসার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলাম, সঙ্গে গুনতে হলো অতিরিক্ত টাকা।
তাই মনে মনে প্রস্তুতি নিয়েছি, আর এমনটা হবে না, ইনশাআল্লাহ। ঝুঁকি এড়ানোর এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তা না হলে জীবনে ভালো কিছু করার দরজা খুলবে না।

মন্তব্য করুন