আজকে প্রথমবার বুঝলাম, অন্য ইউনিভার্সিটির স্যারেদের কাছে আমাদের ডিপার্টমেন্টের স্যারেদের কথার ওজন কতটা। আজকের প্লান্ট ট্যাক্সোনমি কনফারেন্সে না গেলে হয়তো কখনো বুঝতেই পারতাম না। তবে একটা কথা শুরুতেই বলে রাখি, এই ওজনটা ইউনিভার্সিটির নামের নয়, জ্ঞানের। সারা দিন চুপচাপ বসে থেকে এইটুকু খুব পরিষ্কার হয়ে গেছে।
মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ প্লান্ট ট্যাক্সোনমিস্টসের (Bangladesh Association of Plant Taxonomists) প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে সেক্রেটারি, ট্রেজারার, গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর বেশির ভাগই আমাদের ডিপার্টমেন্টের শ্রদ্ধেয় স্যারেদের হাতে। আজকে ছিল অ্যাসোসিয়েশনের বাৎসরিক কনফারেন্স। বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি আর কলেজের রিসার্চার আর প্রফেসররা তাঁদের গবেষণা নিয়ে এসেছিলেন। একেকজন প্রেজেন্টেশন দিচ্ছিলেন, আর প্রেজেন্টেশন শেষে সময় দেওয়া হচ্ছিল, যাতে উপস্থিত বাকিরা সেই গবেষণা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে জিজ্ঞাসা করতে পারেন।
যে বইয়ের লেখকেরা সামনেই বসে
প্রথমেই একজন প্রফেসর তাঁর প্রেজেন্টেশন শুরু করলেন। শুরুতেই তিনি Encyclopedia of Flora and Fauna of Bangladesh বইটির রেফারেন্স টেনে কিছু তথ্য তুলে ধরলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের স্যারেরা ধরিয়ে দিলেন, তথ্যটা ঠিক নয়। তিনি একটু ঘাবড়ে গেলেন, আর সেটাই স্বাভাবিক। একজন মানুষ একটা বইয়ের রেফারেন্স দিয়ে কথা বলছেন, আর সেই বইয়েরই দুজন লেখক সামনে বসে তাঁর ভুল ধরছেন, ঘাবড়ে না গিয়ে উপায় কী? সামনে বসা তাহমিনা ম্যাম সভাপতিত্ব করছিলেন। তিনি বললেন, কোনো প্রশ্ন থাকলে প্রেজেন্টেশনের পরে জিজ্ঞাসা করার সুযোগ দেওয়া হবে।
প্রেজেন্টেশন শেষ হতেই আবার প্রশ্ন শুরু হলো। তিনি তাঁর প্রেজেন্টেশনে পানিছিটকি (Phyllanthus reticulatus) গাছটিকে অ্যাকুয়াটিক প্লান্ট হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। স্যার জিজ্ঞাসা করলেন, এটা অ্যাকুয়াটিক প্লান্ট হয় কী করে, এটা তো মাটিতে হয়। কিছুক্ষণ আলোচনার পর বিষয়টার ফয়সালা হয়ে গেল, পানিছিটকি মাটিতেই হয়। আমরা শুধু আমাদের স্যারেদের জ্ঞানের গভীরতা দেখে মুগ্ধ হয়ে বসে রইলাম। তাঁদের জানাশোনার পরিধি কতটা, সেটা কল্পনাও করা যায় না।
প্রশ্নের পর প্রশ্ন
আমরা তো শুধু চুপচাপ শুনছি আর অবাক হচ্ছি। অন্য ইউনিভার্সিটির প্রফেসররা একের পর এক প্রেজেন্টেশন দিচ্ছিলেন, আর আমাদের স্যারেদের নানা রকম প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তাঁদের বেশ ভাবতে হচ্ছিল। তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে স্যারেদের একটা কথা। তাঁরা বললেন, এখন তো ইন্টারনেটের যুগ, কোনো কিছুতে সমস্যা হলে একটু যোগাযোগ করলেই তো হয়, তাহলে আর কোনো সমস্যা থাকে না। মাঝে মাঝে আমাদের ডিপার্টমেন্টের বড় ভাই আপুরাও তাঁদের প্রেজেন্টেশন দিচ্ছিলেন, আর স্যারেরা তাঁদেরও সমানভাবে নানা প্রশ্ন করছিলেন। নিজের ডিপার্টমেন্ট বলে কোনো ছাড় নেই। আরও ভালো লাগছিল এই দেখে যে স্যারেরাই আবার সেই সমস্যাগুলোর সমাধান বাতলে দিচ্ছিলেন।
ডিপার্টমেন্ট যখন রেস্টুরেন্ট
আর খাবারের প্রশংসা না করলেই নয়। আমাদের ডিপার্টমেন্টে যে খাবার দেয়, তার তুলনা হয় না। একজন বলেছিল, “ডিপার্টমেন্ট যখন রেস্টুরেন্ট”। সত্যিই, আজকে যা খেয়েছি তা চিন্তার বাইরে। এমন একটা দিন কাটল, যেটা অনেক দিন মনে থাকবে।

মন্তব্য করুন