আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তায়ালার রহমতে আজকে খুব সুন্দর একটা দিন কাটল। একদম মনে রাখার মতো একটা দিন। জানি না এমন দিন আবার পাব কি না।
গতকাল সুজন কল দিয়ে বলেছিল, আজকে যেন ক্যাম্পাসে আসি। এমনিই, কোনো কারণ ছাড়াই, ঘুরতে ফিরতে। পরীক্ষাও শেষ, ছুটির দিন, বাসায় বসে এমনিতেও তেমন কিছু করা হচ্ছিল না। তাই সকালে উঠেই রওনা দিলাম ক্যাম্পাসে। পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই সুজনের কল। ভেবেছিলাম সে ক্যাম্পাসেই আছে, কিন্তু সে বলে, ঘুম থেকে উঠলাম, আসছি, একটু অপেক্ষা করো।
রাসিফকে কল দিলাম, সে বলে সেও বাইরে, তারও আসতে একটু সময় লাগবে। কী আর করার, গার্ডেনে গিয়ে একটু ঘুরে ফিরে, কিছু ছবি তুলে হলের দিকে গেলাম। দেখলাম রাসিফ এসেছে, তার সঙ্গে চা খেতে গেলাম। কিছুক্ষণ পরে সুজনও চলে এল।
কোনো প্ল্যান ছাড়াই বেরিয়ে পড়া
এইবার কী করা যায়? ঘুরব ফিরব ঠিক আছে, কিন্তু কোথায়? কোনো প্ল্যান তো নেই। রাসিফ বলল, চলো গার্ডেনে যাই, অনেক দিন যাওয়া হয় না। সুজনও যেতে চাইল দেখে আমি আর দ্বিমত করলাম না, আবারও গেলাম গার্ডেনে। সেখানে এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে বেশ কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে কথায় কথায় বলে বসলাম, চলো রমনায় যাই। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে গেলে একসঙ্গে দুটোই হয়ে যায়। এই বলে বেরিয়ে পড়লাম সেদিকে।
হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। কী যে ভালো লাগছিল, বলার মতো না। মাথায় কোনো প্রেশার নেই, কোনো তাড়া নেই। নিশ্চিন্ত মনে তিনজন মিলে গল্প করতে করতে হাঁটছি, এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে।
সেখানে যেতে যেতেই দেখলাম, অনেকে স্বাধীনতা জাদুঘর দেখার জন্য ভিড় করে আছে। আমি কখনো যাইনি, তাই প্রস্তাব দিলাম, চলো সেখানে যাই। রাসিফও নাকি যায়নি, ভালোই হলো। আমার কী একটা অবস্থা, ক্যাম্পাসের একদম পাশেই এই জাদুঘর, কিন্তু দুই দুইটা বছর পার করে তৃতীয় বর্ষে পা দিয়েছি, তবুও যাওয়ার সুযোগ হয়নি। কেউ শুনলে অট্টহাসি দেবে।
মাটির নিচের জাদুঘর
যাই হোক, গেলাম সেখানে। পুরোটাই মাটির নিচে, সবগুলো রুম আন্ডারগ্রাউন্ড। ১৯৭১ সালের পর থেকে বেশ কিছু পত্রিকার খবর, আর তার সঙ্গে স্মরণীয় কিছু ঘটনা খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এখানে। তবে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে কৃত্রিম ঝরনাটা। দেখার মতো একটা দৃশ্য।
জাদুঘর থেকে বের হতে হতেই দেখি দুপুর দেড়টা বাজে। রমনা আজকে আর হয়ে উঠবে না, সেটা বুঝতে আর বাকি রইল না। আমরা আবার হলের উদ্দেশে রওনা দিলাম।
রাস্তার ধারে গাছ চেনার প্রতিযোগিতা
আসতে আসতে হঠাৎ সুজন বলে উঠল, নাগেশ্বর গাছ। এটা শুনে রাসিফ বলল, Mesua ferrea। আমি আবার একটু মজা নেওয়ার জন্য বললাম, সমনাম Mesua nagassarium। ভাবলাম, এখানে একটা গাছ চেনার প্রতিযোগিতা শুরু করে দেওয়া যাক। তাহলে ওদের কিছু নতুন গাছ চেনা হবে, সঙ্গে সঙ্গে যেগুলো চেনে সেগুলো আরেকটু রিভাইজ হবে।
তাই সেদিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য জিজ্ঞাসা করলাম, এই গাছটা কে চেনো? দেখলাম দুজনেই চেনে, কিন্তু রাসিফ সায়েন্টিফিক নাম বলে সুজনের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে গেল। পরের গাছটার নাম কী, এটা বলাতে রাসিফের আগেই সুজন উত্তর দিয়ে এগিয়ে গেল। তারপরেরটা দুজনেই একসঙ্গে। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলল।
এইভাবে আসতে আসতে রাস্তার ধারের বেশ কিছু গাছের নাম আর বৈজ্ঞানিক নাম জানা হয়ে গেল। ভালোই হলো, ঘোরাফেরাও হলো, সঙ্গে সঙ্গে কিছু পড়ালেখাও। মজার বিষয় হলো, আমরা ল্যাবে গাছ নিয়ে কত কী না করি, কিন্তু বাস্তবে সেই গাছগুলো কজন চিনি?
এইভাবে কিছুদূর যেতেই হঠাৎ দেখা গেল, একটা গাছে দোলনার মতো করে দড়ি বাঁধা আছে। রাসিফ আগে ছুটে গেল, তার দেখাদেখি গেল সুজন। দুজনে মিলে পালাক্রমে অনেক কষ্টে সেটায় দোল খাওয়ার চেষ্টা করছে। আমি তো ভাবছিলাম, কেউ একজন দড়ি ছিঁড়ে ধপাস করে পড়বে, কারণ দড়িটা খুব একটা শক্ত বলে মনে হলো না। কিন্তু তাদের বাচ্চামি দেখে এই চিন্তাটা খুবই নগণ্য বলে মনে হলো। সৌভাগ্য যে তারা অক্ষত অবস্থায় দোল খাওয়া শেষ করল।
মামুন বিরিয়ানি হাউসে ভোজ
হয়তো আরও কিছু সময় সেখানেই কাটত, কিন্তু সুজনের ইমার্জেন্সি কিছু কাজ থাকায় যত দ্রুত সম্ভব আমরা হলে ফিরে এলাম। হলে এসে ভাবলাম সবাই মিলে খেতে যাব, কিন্তু এসে দেখি বেনি আমিন খাবার নিয়ে রেডি, মোমিনুরও খাবার প্লেটে নিয়ে বলে, খেয়ে নিলাম। বাইরে হাসিবুরকে বললাম, সেও খেয়ে ফেলেছে। আসলে আরেকটু আগে আসতে পারলে হতো। সমস্যা নেই, আজ হয়নি, অন্য দিন হবে ইনশাআল্লাহ।
কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে বের হলাম খাবারের উদ্দেশে। যাওয়ার প্ল্যান ছিল অনেক দূর, কিন্তু এই খিদে আমাদের দূরত্বকে সর্বোচ্চ কমিয়ে নিয়ে এল মামুন বিরিয়ানি হাউসে। তিনজন মিলে গেলাম, সুজনের ট্রিটে ভালো খানাই খেলাম, একদম তৃপ্তি সহকারে খেলাম। এমন খাওয়া খেলাম যে আর হেঁটে ফিরে আসার অবস্থা নেই।
সেখানেই বসে রইলাম, আর যখন মনে হলো দেহ এবার একটু হাঁটার সায় দিচ্ছে, তখন কোনো রকমে উঠে এলাম হলের দিকে। আসতে আসতে শহীদুল্লাহ হলে খেলা চলছে দেখে গেলাম সেদিকে। আমি আর সুজন চলে এলাম, আর রাসিফ সেখানে থেকে গেল।
সুজন হলে এসে শুয়েই পড়ল। জিজ্ঞাসা করায় বলল, আমি বাড়ি যাব না। আর আমি আমার ৫.১০-এর ফাল্গুনী ধরে বাসায় ফিরে এলাম।
চমৎকার একটা দিন কাটল। আবারও চাই, এমন কতগুলো দিন ফিরে আসুক আমাদের জীবনে। এইবার ইনশাআল্লাহ রমনা পার্কে যাব। খুব শীঘ্রই যাব।

মন্তব্য করুন