তিনি কি সত্যিই রিকশাওয়ালা ছিলেন?

Md. Siddiq Hasan অ্যাভাটার
পড়তে ৬ মিনিট
এই লেখায়

আজ ১২টায় সাইটোলজির ইনকোর্স পরীক্ষা ছিল। প্রথম ক্লাসের পর ফাঁকা থাকায় সবাই মিলে চা-টা খেয়ে একটু পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে কেমিস্ট্রির সামনে বসে পড়লাম। একজন খাতা বের করল তো আরেকজন শিট। একজন দেখলাম নেট থেকে কিছু টপিক প্রিন্ট করে নিয়ে এসেছে। সবার পড়া শুরু করার গতি দেখে ভালো লাগল। সবাইকে দেখে আমিও খাতা খুলে নানা জিনিস দেখতে লাগলাম। পড়াও চলে, সঙ্গে গল্পও চলে। হরেক রকম চিত্রের সঙ্গে হরেক রকম গল্পের টপিক যেন একটার সঙ্গে আরেকটা মিলে যাচ্ছিল।

একটা প্রশ্ন ছিল

হঠাৎ দেখলাম এক রিকশাওয়ালা রিকশাটা একপাশে দাঁড় করিয়ে আমাদের দিকে এসে বললেন, একটা প্রশ্ন ছিল। আমরা বললাম, বলেন কী প্রশ্ন। ভেবেছিলাম হয়তো কোনো ডিপার্টমেন্ট চিনতে পারছেন না, সেটাই জিজ্ঞেস করবেন, অথবা আশপাশে পানি কোথায় পাওয়া যাবে, এই ধরনের কিছু। অচেনা মানুষ সাধারণত এ রকম প্রশ্নই করে। কিন্তু তাঁর প্রশ্ন শুনে কিছুটা হতভম্ব হলাম। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারিনি। বললাম, আবার বলেন। আবার বলার পরেও বুঝতে পারিনি, তবে তিনি যে একটা অঙ্ক জিজ্ঞেস করছেন সেটা টের পেলাম। আবার বললাম, ভাই, আরেকবার বলেন। এবার তিনিসহ বাকিরা সবাই আমাকে প্রশ্নটা বলল: যদি ১০০ টাকার ৫ বছরে চক্রবৃদ্ধি মুনাফা ৫০ টাকা হয়, তাহলে ১ বছরে ৫০ টাকা মুনাফা পেতে কত টাকা দিতে হবে? সবার মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। সবাই মনে মনে হিসাব করছে দেখে আমিও হিসাব শুরু করলাম। বলে বসলাম, হিসাবটা বেশি জটিল না। ৫ বছরে ৫০ টাকা, তাহলে ১ বছরে ১০ টাকা, তাহলে…

একটু একটু… চক্রবৃদ্ধি মুনাফা? ও, এটা হলে তো এভাবে করা যাবে না। যতটা সহজ ভেবেছিলাম, ততটা সহজ না অঙ্কটা। এটা করার জন্য কী কী যেন সূত্র ছিল: n, r, p, কার ওপর কার পাওয়ার, হাবিজাবি অনেক ঝামেলা। আর আমি তো মনে হচ্ছে সব ভুলে গেছি। এবার কী হবে, আমি তো পারি না! বাকিদের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, তাদেরও একই অবস্থা। সেই কবে করেছি এগুলো, এখন কি আর হঠাৎ মনে পড়ে? শহিদুল রিকশাওয়ালাকে বলল, ভাই, এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে কী করবেন? কাউকে পড়াবেন নাকি? তিনি বললেন, জি, দুইটা বাচ্চা আছে, একটা ক্লাস ফাইভে পড়ে, একটা ক্লাস থ্রিতে। ও, আচ্ছা, আপনার বাসা কোথায়? উত্তর: গাইবান্ধা। তিনি গাইবান্ধায় পড়ান, কথাটা একটু কেমন লাগল। সারাদিন এখানে, আর পড়ান গাইবান্ধায়? এটাই সমাধান করতে হিমশিম খাচ্ছি, রিকশাওয়ালা ভাই আবার বললেন, ভাই, আরেকটা প্রশ্ন আছে। ভালো, বলেন।

অ্যাডজেকটিভ কোথায় বসে?

অ্যাডজেকটিভ কোথায় বসে, ভার্বের আগে না পরে? এতক্ষণ অঙ্ক সমাধানের চেষ্টায় থাকলেও এই প্রশ্ন শুনে পরিবেশটা মুহূর্তে বদলে গেল। তাঁর কথাবার্তা আর রিকশাওয়ালাদের মতো মনে হচ্ছিল না।

রাসিফ বলল, ক্লাস ফাইভে চক্রবৃদ্ধির অঙ্ক আছে? আমরা তো আরও ওপরের ক্লাসে পড়েছিলাম, এগুলো তো ক্লাস নাইনের প্রশ্ন।

শামীম বলল, ভাই, আপনি কি কোনো রিপোর্টার? কোনো সার্ভে করছেন? তিনি বললেন, না ভাই, এমনিতেই জিজ্ঞেস করছিলাম। কনককে দেখলাম একটু অন্যভাবে বসে পড়ল। তাদের সন্দেহ আমাকেও সন্দিহান করে তুলল। আমারও জানার ইচ্ছা হলো, উনি আসলে কে? জিজ্ঞেস করলাম, ভাই, আপনি কতদূর পড়ালেখা করেছেন? উত্তর এল, ক্লাস ফোর। শুনে সন্দেহ তীব্র হলো। ক্লাস ফোরে পড়ে ক্লাস ফাইভের বাচ্চাকে পড়ায়, হাস্যকর না? শামীমের কথা ঠিক হলে, রিপোর্টার হলে তো ক্যামেরা থাকবে। আমরা তাঁর চারপাশে ক্যামেরা খোঁজা শুরু করলাম। অনেকক্ষণ দেখেও চোখে পড়ল না। তাহলে কি সত্যিই রিকশাওয়ালা? পোশাকও সাধারণ রিকশাওয়ালাদের মতোই, সেরকম কোনো পার্থক্য চোখে পড়ে না। না, কিছু একটা গোলমাল আছে, ধরতে পারছি না। আবার জিজ্ঞেস করা হলো, ভাই, এই অঙ্ক কোথায় পেয়েছেন? কেউ কি আপনাকে করতে দিয়েছে? এবার উত্তরে একটু ভিন্নতা এল: ভাই, কিস্তিতে টাকা দিতে হয় তো, তাই জিনিসটা কীভাবে চলে জানতে পারলে ভালো হয়। শামীম বারবার ইশারা করছে, আশপাশে ক্যামেরা আছে কি না চেক করতে। কিছুই চোখে পড়ে না।

সবকিছুই স্বাভাবিক, শুধু শার্টের পকেটটা একটু উঁচু, কিন্তু এতটাও না যে ক্যামেরা থাকতে পারে। মোবাইল ফোন আছে বলেও মনে হয় না। যাই হোক, এখন তাঁর প্রশ্নের কিছু উত্তর তো দিতে হবে। কী উত্তর দেব? নাকি বলে দেব, আমরা এই মুহূর্তে পরীক্ষার টেনশনে আছি, পরে যোগাযোগ করতে?

অবশেষে শামীম তাঁকে বলল, এই অঙ্কগুলো আমাদের সায়েন্স ফ্যাকাল্টির কেউ সহজে পারবে না, কারণ এগুলো আমাদের সেরকম প্রয়োজন হয় না, অনেক দিন চর্চাও নেই। তবে যারা বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তারা পরীক্ষার তাগিদে এগুলো মনে রাখে, সেটা ভিন্ন বিষয়। যেদিন আমাদের এ ধরনের অঙ্ক প্রয়োজন হবে, সেদিন একটু প্র্যাকটিস করলেই পেরে যাব। তিনি সব শুনলেন, আর আমাদের আবার ইংরেজির সেই প্রশ্নের জালে জড়িয়ে ফেললেন: এই শিটগুলো তো ইংরেজিতে, তাহলে তো আপনাদের ইংরেজির নিয়ম পারার কথা। শিট বলতে রাসিফের হাতের শিটটা খেয়াল করলাম, তাই তো, উনি এটাও খেয়াল করেছেন! ভালোই পর্যবেক্ষণ। আমি একটু দ্বিধা করে বললাম, অ্যাডজেকটিভ নাউনের আগে বসে। এবার তিনি নানা উদাহরণ দিয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, কোনটা নাউন, কোনটা ভার্ব, কোনটা অ্যাডজেকটিভ। আমরা তো অবাক, বাহ!

ক্লাস ফোরে পড়া একজন মানুষ এত সুন্দর করে কীভাবে ইংরেজি বলতে পারে? আমরাই এভাবে বলতে পারব কি না জানি না। আবার কিছু একটা বলা লাগবে। আবারও শামীম সাপোর্ট দিল। সে বলল, ভাই, আমরা যা পড়ি সব ইংরেজিতে ঠিক আছে, কিন্তু আমরা তো কোনটা ভার্ব আর কোনটা নাউন, এভাবে হিসাব করি না। আমাদের পড়ানো সবকিছু সাধারণ কথাবার্তা: আমি ভাত খাই-এর ইংরেজি I eat rice, এটা সবাই জানে। নিয়মকানুন তো আর শিখি না। এবার তিনি আরেক সমস্যায় ফেলার চেষ্টা করলেন: তাই নাকি? তাহলে ‘এটি আমার রিকশা’-র ইংরেজি কী? তারপর টানা প্রশ্ন করে গেলেন আর শামীম উত্তর দিতে থাকল: আমি নীলক্ষেত যাই? আমি নীলক্ষেত থেকে ফিরে আসি? আমি রান্না করার পর ভাত খাই? ইত্যাদি। এগুলোর উত্তর পেয়ে যাওয়ার পরেও তাঁর পরের প্রশ্ন: কোন ডিপার্টমেন্ট আপনাদের? উদ্ভিদবিজ্ঞান বলায় তিনি বললেন, উদ্ভিদ কী? আজব! উদ্ভিদ কী, এটা কোনো প্রশ্ন হলো? আমাদের চারপাশের সব গাছপালাই তো উদ্ভিদ। কেমিস্ট্রির ফাঁকে বিদ্যাপাতা ছিল, সেটা দেখিয়ে শামীম বলল, এটাও একটা উদ্ভিদ। মাশরুমের নাম শুনেছেন কখনো? সেটাও উদ্ভিদের অন্তর্ভুক্ত। আরও আশ্চর্য হলাম যখন তিনি বললেন, এর সম্পর্কিত বিষয় কী, প্রাণিবিদ্যা? তাহলে প্রাণী কী? গরু-ছাগল কি প্রাণী? আমরা বললাম, উদ্ভিদ বাদে যা জীবন্ত, সবই প্রাণী, মাছ আর পোকামাকড়ও। এত জ্ঞান একজন সাধারণ ক্লাস ফোর পাস রিকশাওয়ালা রাখতে পারে না, তাতে আর সন্দেহ ছিল না। একটু পরে তিনি বললেন, ওরা কারা? মুখ বাড়িয়ে দেখলাম কিছু বিদেশি। আমাদের সঙ্গে কথা শেষ করে রিকশা নিয়ে তাঁদের দিকে গিয়ে তিনি বললেন, Have a nice day…

তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে, মনে হাজারো প্রশ্ন জাগিয়ে, একটি রহস্যময় হাসি দিয়ে রিকশায় চড়ে চলে গেলেন।

আসলেই তিনি কে ছিলেন?

আমাদের মনে একটাই প্রশ্ন থেকে গেল: আসলেই তিনি কে ছিলেন?

শামীম বলল, কিছু কিছু রিপোর্টার এ রকম ছদ্মবেশে আসে আর কৌশলে তথ্য সংগ্রহ করে। ছদ্মবেশ বানাতে আর কী, নীলক্ষেত থেকে একটা রিকশা দেড়শো টাকায় ভাড়া নিতে বেশি কষ্ট না। এই ছদ্মবেশে হঠাৎ প্রশ্ন করলে জানা জিনিসও ভুল হতে পারে। তারা এই সুযোগটাই কাজে লাগায়, প্র্যাংক ভিডিও বানায়, আর দিন শেষে হয়তো এভাবেই ‘I am GPA 5’-এর মতো ভিডিও তাদের সংগ্রহে চলে যায়। আসলে তাদের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তাদেরই প্রশ্ন করা উচিত, তাদেরই সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা দরকার। রাসিফ বলল, পরীক্ষাটা শেষ হোক, তার পেছনে ক্যামেরা নিয়ে লেগে পড়ব। কতদূর আর গেছে, কার্জন হলে কিছু না পেলে যাবে কলাভবনে, সেখানেই ধরব।

ও… পরীক্ষা! একদম ভুলেই গিয়েছিলাম, এতক্ষণ তো তাঁর সঙ্গে কথা বলেই সময় কাটিয়েছি। আর বেশি সময় হাতে নেই। দ্রুত দেখতে হবে বলে আবার সবাই লেগে পড়লাম নিজ নিজ শিট-খাতা নিয়ে, পরীক্ষায় পাস করার অভিযানে।

Md. Siddiq Hasan অ্যাভাটার

লিখেছেন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।