মনমরা হয়ে গালে হাত দিয়ে বসে আছে দুঃখ। তার পাশ দিয়ে সবাই গা ঘেঁষে হেঁটে চলে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ তার খোঁজখবর নিচ্ছে না। কেউ কেউ তো তাকে বসে থাকতে দেখে অন্য রাস্তা দিয়ে চলে যায়, এই ভয়ে, যদি পিছু নেয়! সে বসে আছে, একা একা বসে আছে তো আছেই। কেউ তাকে পছন্দ করে না, তাই তার গুরুত্বও কেউ দেয় না। আসলে না চাইতেই চলে আসে। অনেক নিষেধ করার পরেও সে কারও কথা শোনে না, বাসায় চলে যায়। সবার কাছে কী যে চায়, সে হয়তো নিজেও জানে না। সবাই তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে চায়, তারপরেও সে ঘাপটি মেরে বসে থাকে, চলে যায় না। যেদিন মন চায়, সে অন্যজনের বাসায় চলে যায়। সেখানেও একই অবস্থা, তাকে কেউ রাখতে চায় না। তারপরেও সে বেহায়ার মতো এ-বাসা ও-বাসা সব জায়গায় যায়। তাকে গালিগালাজ করলেও তার কিছু মনে হয় না। তার নামটাই তো গালির মতো হয়ে গেছে। মানুষ তাকে ভয় পায়, ঘৃণা করে, কিন্তু তার এসবে কিছু যায়-আসে না।
সে কখনো সুখের মতো হতে চায় না। সুখ মানুষের সবচেয়ে কাছের। কেউ কেউ তো তাদের সবকিছু বিলিয়ে দেয় শুধু একবার তার দেখা পাওয়ার জন্য। কিন্তু তাকে এত গুরুত্ব দেওয়া হয় বলেই সে কাউকে পাত্তা দেয় না। মাঝে মাঝে ক্ষণিকের জন্য একটু উঁকি দেয়, তাকে পাওয়ার জন্য চারপাশে সবাই কী কী করছে, সেটা দেখার জন্য, দেখে মজা পাওয়ার জন্য। সে খুব নিষ্ঠুর। সুখ খুবই নিষ্ঠুর, নির্দয়। সে জানে, তাকে পাওয়ার জন্য, বেশি না, শুধু একটু দেখার জন্য, সবাই জীবনের শেষ পুঁজিটুকু বিলিয়ে দিচ্ছে। তারপরেও কারও বাসায় যাওয়ার সামান্যতম ইচ্ছাও তার মনে জাগে না।
কেন সুখ এত হৃদয়হীন?
তাকে সবাই এত চায় বলে কি তার মনে ভাব ধরেছে, দেমাগ বেড়েছে? নাকি তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে সে অন্যদের গুরুত্বহীন মনে করে?
কেউ চিন্তা করে না। চিন্তা করার কোনো ইচ্ছাও নেই। শুধু অন্ধের মতো তাকে সবাই পেতে চায়, একবারের জন্য হলেও তার দেখা পেতেই হবে, সবকিছু উজাড় করে দিয়ে হলেও একবার, শুধু একবার।
কিন্তু মানুষ বোঝে না, সে তো আসে শুধু জীবনের ভালো সময়ে, যে সময়ে তার কোনো প্রয়োজন নেই, সে না এলেও কোনো অসুবিধা ছিল না। সে কারও কাছে তখনই যায়, যখন তার জন্য আর অপেক্ষা করা হয় না, তার দেখা পাওয়ার আশা ছেড়ে দেওয়া হয়, কারণ তার গুরুত্ব কারও কাছে কমে যাক, এটা সে চায় না। একটু দেখা দিয়ে আবার তার জন্য চাহিদা বাড়িয়ে চলে যায়, আর চলে গিয়ে রাজপ্রাসাদে বসে দেখে, তার জন্য সবাই কত কী করছে।
বরং যাকে আমরা ঘৃণা করি, অপছন্দ করি, সেই দুঃখই আমাদের সবচেয়ে কষ্টের সময়ের সাথি। সব সময় পাশে পাই তাকে। কিন্তু আমরা তাকে ভুল বুঝে মনে করি, তার জন্যই জীবনে কঠিন সময় আসে। সে অকারণেই সবার অবহেলার পাত্র। আমরা তার সঙ্গে শত্রুর মতো আচরণ করলেও সে আমাদের ভালো বন্ধু মনে করে, তাই সবচেয়ে কঠিন সময়ে সে পাশে থাকে, সবার পাশে থাকে, আমরা না চাইলেও।

মন্তব্য করুন